মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করার আহ্বান জানিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে (আইসিটি) একটি চিঠি দিয়েছে লন্ডনভিত্তিক আইন প্রতিষ্ঠান ‘কিংসলে ন্যাপলি’।
সোমবার (৩০ মার্চ) শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে পাঠানো ওই চিঠিতে ট্রাইব্যুনালের আদেশ অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ করে, যথাযথ নোটিশ প্রদান এবং তার পছন্দের আইনজীবীর উপস্থিতি নিশ্চিত করে নতুন করে ট্রাইব্যুনাল গঠনের আহ্বানও জানানো হয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, এসব বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, তা ১৪ দিনের মধ্যে (১৩ এপ্রিলের মধ্যে) জানাতে হবে।
১০ পৃষ্ঠার ওই চিঠির একটি অনুলিপি গণমাধ্যমের হাতে এসেছে বলে জানা গেছে। এতে বিচার প্রক্রিয়ার নানা ত্রুটি ও অসঙ্গতি তুলে ধরা হয়েছে। তবে চিঠিতে স্পষ্ট করে বলা হয়, এই যোগাযোগের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালের বৈধতা স্বীকার করা হচ্ছে না; বরং শেখ হাসিনা ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার চ্যালেঞ্জ করার অধিকার সংরক্ষণ করেন।
চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, বিচার কার্যক্রম একটি বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশে পরিচালিত হয়েছে। সেখানে আওয়ামী লীগ ও এর সমর্থকদের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী সরকারের ধারাবাহিক পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করা হয়। ২০২৫ সালের মে মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা, আইনজীবীদের গ্রেপ্তার এবং শারীরিক হামলার অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে।
বিচার প্রক্রিয়ায় মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে বলা হয়, ১৯৭৩ সালের আইসিটি আইন মূলত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন অপরাধ বিচারের জন্য প্রণীত। কিন্তু ২০২৪ সালে আইন সংশোধনের মাধ্যমে সাম্প্রতিক বিক্ষোভসংক্রান্ত ঘটনাকে এর আওতায় আনা হয়েছে, যা ট্রাইব্যুনালের মূল উদ্দেশ্যের বাইরে বলে দাবি করা হয়।
এছাড়া বিচারিক স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, ট্রাইব্যুনালের বেঞ্চ ও প্রসিকিউশন টিম পুনর্গঠন করা হয়েছে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দিয়ে। বিচারকদের নিয়োগ ও অপসারণ প্রক্রিয়াও স্বচ্ছ ছিল না বলে অভিযোগ করা হয়।
প্রসিকিউশন টিমের বিরুদ্ধেও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আনা হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটরসহ একাধিক সদস্যের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরে বলা হয়, এতে ট্রাইব্যুনালের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার অভিযোগে বলা হয়, অভিযোগ গঠনের আগে যথাযথ নোটিশ দেওয়া হয়নি এবং শেখ হাসিনাকে নিজের পছন্দের আইনজীবী নিয়োগের সুযোগও দেওয়া হয়নি। এমনকি রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীর সঙ্গেও কার্যকর যোগাযোগের সুযোগ ছিল না বলে দাবি করা হয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে বিচার কেবল বিশেষ ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়, কারণ তাকে দেশে ফেরাতে সরকার অন্য রাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে—যা তার অনুপস্থিতি স্বেচ্ছায় ছিল না বলে ইঙ্গিত করে। এ অবস্থায় এমন প্রক্রিয়ায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের পরিপন্থী বলে উল্লেখ করা হয়।
চিঠির শেষে কয়েকটি দাবি তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—রায় ও সাজা বাতিল, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত রাখা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নতুন বিচার প্রক্রিয়া চালু করা এবং সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি উত্থাপিত ত্রুটিগুলো স্বীকার করে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, লন্ডনভিত্তিক একটি গ্রুপ বিষয়টি সমন্বয় করছে। তবে কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অন্যদিকে, ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন বলেন, এ ধরনের কোনো আবেদন বা চিঠি সম্পর্কে তিনি অবগত নন।
প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা বলেন, এ ধরনের একটি চিঠির কথা শোনা গেলেও এখনো তারা কোনো আনুষ্ঠানিক কপি পাননি। তার ভাষ্য, শুধু চিঠি পাঠালেই তা আইনি ভিত্তি পায় না।