গঙ্গাচড়া (রংপুর): রংপুরের গঙ্গাচড়ায় দারিদ্র্য ও অসুস্থতার নির্মম বাস্তবতায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন এক দম্পতি। দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ ও অ্যাজমায় আক্রান্ত স্বামী প্রায় কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন, আর মেরুদণ্ডের জটিল রোগে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছেন স্ত্রী। চিকিৎসার অভাব, অনাহার আর নিঃসঙ্গতার মধ্যে দিন পার করছেন তারা। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত চিকিৎসা না পেলে দুজনের জীবনই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
অরজুন চন্দ্র (৫৪) ও তার স্ত্রী কেশনা বালা (৪৮) রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার আলমবিদিতর ইউনিয়নের পাইকান বাঁধপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। দুই কন্যাসন্তানের জনক-জননী এই দম্পতির উভয়েই বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ—অরজুন চন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ ও অ্যাজমায় ভুগছেন এবং কর্মক্ষম নন, আর কেশনা বালা মেরুদণ্ডের জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। চরম দারিদ্র্য ও চিকিৎসার অভাবে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সাল থেকে অরজুন চন্দ্র হৃদরোগ ও অ্যাজমায় ভুগছেন। দীর্ঘ সাত-আট বছর ধরে তিনি কার্যত কর্মক্ষম নন। কোনো রকমে তিস্তা নদীতে মাছ ধরে সামান্য যা আয় হতো, তা দিয়েই চলত সংসার। দম্পতির দুই মেয়ে থাকলেও তাদের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় বাড়িতে দেখভালের মতো কেউ নেই।
সংসারের দায়িত্ব তখন তুলে নেন কেশনা বালা। মানুষের বাড়িতে দিনমজুরের কাজ করে স্বামীর চিকিৎসা ও সংসারের খরচ চালাতেন তিনি। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে ২০২৩ সাল থেকে তিনিও মেরুদণ্ড ও কোমরের হাড় ক্ষয়জনিত জটিল রোগে আক্রান্ত হন। গত তিন মাসে তার শারীরিক অবস্থার এতটাই অবনতি হয়েছে যে, এখন তিনি পুরোপুরি শয্যাশায়ী।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তার মেরুদণ্ডের হাড় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে উন্নত চিকিৎসা ও এমআরআই (MRI) করানো প্রয়োজন। তবে চিকিৎসার ব্যয় বহন করার সামর্থ্য না থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে তাকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্ত্রীর এই অবস্থায় ভেঙে পড়েছেন অরজুন চন্দ্র। নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়ায় তিনি প্রায় মৃত্যুশয্যায় দিন কাটাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন প্রতিবেশীরা।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে অরজুন চন্দ্র বলেন, আমি নিজেই ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারি না। এখন আমার স্ত্রীর এই অবস্থা দেখে বুকটা ফেটে যায়। ওকে চিকিৎসা করানোর মতো সামর্থ্য আমার নেই। আমরা কি আর বাঁচতে পারব না?
অন্যদিকে শয্যাশায়ী কেশনা বালা কষ্টভরা কণ্ঠে বলেন, আগে মানুষের বাড়িতে কাজ করে কোনোভাবে সংসার চালাতাম। এখন নিজের শরীরই আর চলে না। বিছানায় পড়ে আছি, কারো ওপর বোঝা হয়ে গেছি। একটু চিকিৎসা পেলে হয়তো আবার দাঁড়াতে পারতাম। আমাদের দিকে কেউ একটু তাকান।
এলাকাবাসী জানান, স্থানীয়ভাবে কিছু অর্থ সংগ্রহ করে সামান্য ওষুধ কেনা গেলেও বড় ধরনের চিকিৎসা ব্যয় জোগানো সম্ভব হয়নি। তাদের দুই মেয়েরও আর্থিক অবস্থা দুর্বল হওয়ায় চিকিৎসার ভার নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে চিকিৎসা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে, এমনকি অনেক দিন ধরে ঘরে ঠিকমতো চুলাও জ্বলছে না।
স্থানীয় ইউপি সদস্য ও বাসিন্দাদের ভাষ্য, দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে কেশনা বালার সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং অরজুন চন্দ্রের জীবনও রক্ষা পেতে পারে।
এ অবস্থায় অসহায় এই দম্পতির পাশে দাঁড়াতে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, দানশীল সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবীদের প্রতি জরুরি মানবিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তাদের মতে, সামান্য সহানুভূতি ও সহযোগিতাই পারে একটি পরিবারকে নিশ্চিত বিপর্যয় থেকে ফিরিয়ে আনতে।
নিউজ ডেস্ক
