যুবদল নেতাসহ দুই হত্যা মামলার আসামি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উপ-কমিশনার মোহাম্মদ মাহবুব আলম খানকে ফেনীর পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৫ মে) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের পুলিশ-১ শাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে তাকে পদায়ন করা হয়।
বুধবার (৬ মে) তার পদায়ন বাতিলের আবেদন জানিয়ে এবং তাকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লিখিত আবেদন করেছেন হত্যার শিকার যুবদল নেতার পরিবারের এক সদস্য।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে দীর্ঘদিন চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ছিলেন মাহবুব আলম খান। ওই সময় বিএনপি-জামায়াতের কর্মসূচিতে বাধা, হামলা, তাদের নেতাকর্মীদের ব্যাপক নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে মাহবুব আলমের বিরুদ্ধে। তৎকালীন বিরোধী দলের একাধিক নেতাকর্মীর হত্যাকাণ্ডে মাহবুবের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন।
২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে বদলি হন। সবশেষ তিনি সিএমপির ডিবি পশ্চিম জোনের ডিসি হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন হলে মাহবুবের কর্মকাণ্ড সামনে আসে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আদালত ও থানায় তার বিরুদ্ধে দুটি হত্যা মামলা করেন ভুক্তভোগীরা।
এর মধ্যে একটি রয়েছে জেলার শিবগঞ্জ থানার যুবদল নেতা মিজান হত্যা মামলা। ওই মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ২৭ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ থানায় পুলিশের কথিত বন্দুকযুদ্ধে মিজান নিহত হন। এ ঘটনায় নিহতের বাবা আইনাল হক ২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর শিবগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। ওই মামলার ১০ নম্বর আসামি হিসেবে মাহবুব আলম খানের নাম রয়েছে।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়, আইনাল হকের চার ছেলের মধ্যে সেতাউর রহমান ছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এবং মিজানুর রহমান ইউনিয়ন যুবদলের কর্মী। ২০১৬ সালের ১৭ আগস্ট ছাত্রদল নেতা সেতাউর রহমানকে আটকের উদ্দেশ্যে আইনাল হকের বাড়িতে পুলিশ অভিযান চালায়। সেতাউরকে না পেয়ে পুলিশ তার ভাই মিজানুর রহমানকে তুলে নিয়ে যায়। পরে মিজানুর রহমানকে আটকের বিষয়টি পুলিশ অস্বীকার করে। ঘটনার পর ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যরা তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহবুব আলম খানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি খোঁজ নেওয়ার আশ্বাস দেন। পরে এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, মিজানুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে।
এজাহারে আরও বলা হয়, আইনাল হকের আরেক ছেলে তৎকালীন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রেজাউলের কাছে মিজানুরকে ছেড়ে দেওয়া বাবদ ২০ লাখ টাকা দাবি করেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তা। পরে বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ভুক্তভোগীর পরিবারকে ৮ লাখ টাকা দেন। ভুক্তভোগীর পরিবার আরও এক লাখ টাকা জোগাড় করে পুলিশকে মোট ৯ লাখ টাকা প্রদান করে। এরপরও পুলিশ আরও ১১ লাখ টাকা দাবি করে।
পুলিশের সঙ্গে দরকষাকষি চলাকালে একপর্যায়ে ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর রেজাউল করিমকে রাজশাহী নগরের সাহেববাজার এলাকার একটি মেস থেকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয়। এরপর অনেক দিন দুই ভাই নিখোঁজ থাকেন। পরে ২০১৭ সালের ১৭ এপ্রিল জঙ্গি আস্তানায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় চারজন নিহত হওয়ার একটি ঘটনা সাজানো হয়। ভুক্তভোগীদের পরিবারকে জানানো হয়, বন্দুকযুদ্ধে তাদের ছেলে মিজানুর নিহত হয়েছেন। আরেক ভাই রেজাউল করিমের কথা পুলিশ অস্বীকার করতে থাকে। তার সন্ধান এখনো মেলেনি।
সরকার পরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট শিবগঞ্জে সংবাদ সম্মেলন করেন মিজানুর ও রেজাউলের পরিবারের সদস্যরা। আট বছর আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে নিখোঁজ ভাইয়ের সন্ধান চান তারা।
একই বিষয়ে থানায় মামলার পাশাপাশি গুম কমিশনেও অভিযোগ দিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে গুম কমিশন ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটররা বিষয়টি তদন্ত করতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ যান।
আইনাল হকের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শিবগঞ্জ থানার পুলিশ পরিদর্শক মাহমুদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, এই মামলায় ৬ থেকে ৭ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি আসামিরা পলাতক রয়েছেন। মামলাটি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তদারকি করছেন। বাকি আসামিদেরও যেকোনো সময় গ্রেপ্তার করা হবে।
মাহবুব আলম খানের এসপি পদে পদায়ন বাতিলের আবেদন জানিয়ে এবং তাকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে বুধবার (৬ মে) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লিখিত আবেদন করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সেতাউর রহমান।
তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, এএসপি মাহবুব আলম খান চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রায় ৮ বছর চাকরি করেছেন। এমন কোনো অপরাধ নেই, যা তিনি করেননি। তিনি আমাদের পরিবার ধ্বংস করে দিয়েছেন। কত মায়ের বুক খালি করেছেন, তার কোনো হিসাব নেই। মামলা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তার পদায়ন হয়। আমরা এর একটা বিহিত চাই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর ফিরোজ আহমেদ নামে একজন বাদী হয়ে শিবগঞ্জ থানায় আরও একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় ১২ জন আসামির মধ্যে মাহবুব আলম খানকে তিন নম্বর আসামি করা হয়েছে। মামলার সময় তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শিবগঞ্জ থানার এসআই ইমরান হোসেন বলেন, প্রাথমিক তদন্তে তার নাম বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এখনো পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে সিএমপির উপ-কমিশনার মোহাম্মদ মাহবুব আলম খান ঢাকা পোস্টকে বলেন, দুটি হত্যা মামলার মধ্যে একটিতে ইতোমধ্যে আমাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। বাকিটিতে অর্থাৎ আইনাল হক যে মামলার বাদী সেটির ঘটনার সময় আমি ট্রেনিংয়ে ছিলাম। এ সংক্রান্ত প্রমাণ আমি সংশ্লিষ্টদের দিয়েছি। ওই মামলায়ও আমাকে অব্যাহতি দেওয়া হবে বলে আশা করছি।
এ বিষয়ে জানতে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইনকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
একই বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (এডমিন) আবু সালেহ রায়হান বলেন, আমি মাত্রই এখানে যোগদান করেছি। বিস্তারিত খোঁজ খবর না নিয়ে কিছু বলতে পারছি না।
মানবাধিকার আইনজীবী অ্যাডভোকেট জিয়া হাবিব আহসান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ফৌজদারি মামলায় জামিন নেননি মানে তিনি পলাতক। তাকে অবশ্যই পুলিশ থেকে বরখাস্ত করা দরকার। যাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, তাদের পদায়নের ক্ষেত্রে সরকারকে আরও সতর্ক হওয়া দরকার। এসপি মানে– জেলার শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা। এ ধরনের পদে এরকম লোক বসালে, ২৪-এর গণবিপ্লব বেহাত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
নিউজ ডেস্ক