গত দুই দশক ধরে কূটনীতি, নিষেধাজ্ঞা, সাইবার হামলা ও অন্তর্ঘাতের মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির গতি থামানোর চেষ্টা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে গত রোববার (স্থানীয় সময় ভোররাত আড়াইটা) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক নজিরবিহীন সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেন, যা তার পূর্বসূরিদের কেউই ঝুঁকি নিয়ে বাস্তবায়ন করেননি।
নিউইয়র্ক টাইমসের জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক ডেভিড ই. স্যাঙ্গারের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বি-২ বোমারু বিমান ব্যবহার করে ইরানের সবচেয়ে সুরক্ষিত এবং গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনা, বিশেষ করে ফোর্দো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রে আঘাত হানার নির্দেশ দেন। মাটির অনেক গভীরে অবস্থিত এ কেন্দ্রটি এতদিন ইসরায়েলের সক্ষমতার বাইরে ছিল।
এর মূল লক্ষ্য ছিল ফোর্দোতে মাটির গভীরে থাকা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র, যা ইসরায়েলের নাগালের বাইরে ছিল। ট্রাম্পের জন্য একটি শত্রু দেশের পারমাণবিক অবকাঠামোতে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত তার দ্বিতীয় মেয়াদের সবচেয়ে বড় এবং সম্ভাব্য সবচেয়ে বিপজ্জনক জুয়া।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি—এই অভিযান একটি সীমিত ও ‘সুনির্দিষ্ট’ সামরিক পদক্ষেপ, যার লক্ষ্য ছিল কেবল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করা। কর্মকর্তারা এটিকে ২০১১ সালের বিন লাদেন হত্যার মতো নিয়ন্ত্রিত অভিযান হিসেবে তুলে ধরছেন।
ইরানের পারমাণবিক সংস্থা এই হামলাকে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল বলে উল্লেখ করেছে এবং জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষক সংস্থা আইএইএ-কে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। দেশটি ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (NPT) থেকে সরে আসার বিষয়টি বিবেচনা করছে।

ইরানের ফর্দো পারমাণবিক স্থাপনা। ছবি: রয়টার্স
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ওপর হামলার হুমকিও দেন ট্রাম্প। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ইরান যদি প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করে, তবে আরও বড় পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ছবি: রয়টার্স
এই হামলার সময় ইরান আঞ্চলিকভাবে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলার পর হিজবুল্লাহ, হামাসসহ ইরানের ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র মিত্রদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সিরিয়ায় থাকা ইরানি প্রভাবও কমে এসেছে। এমন প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপ ইরানকে কোণঠাসা করে ফেলেছে।
রাশিয়া ও চীনের মতো মিত্র রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকেও এখনো দৃঢ় সমর্থন পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে পারমাণবিক কর্মসূচিই ইরানের একমাত্র কৌশলগত প্রতিরক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মার্কিন কংগ্রেসের অনেকেই ট্রাম্পের একক সিদ্ধান্তে এমন হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার বলেন, কংগ্রেসকে না জানিয়ে এবং সুনির্দিষ্ট কৌশল ছাড়াই এমন সিদ্ধান্ত বিপজ্জনক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

আমেরিকার যুদ্ধবিমান। ছবি: রয়টার্স
বিশ্লেষকদের মতে, যদি ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি আরও গোপনে এবং জোরালোভাবে চালু করে দেয়, তবে তা উত্তর কোরিয়ার পথ অনুসরণ করার ঝুঁকি তৈরি করবে। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার এখন প্রায় ৬০টি পরমাণু অস্ত্র রয়েছে। ইরানও এমন সক্ষমতা অর্জনের দিকেই এগোতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলা ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংসে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেললেও, এটি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত এবং পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার নতুন অধ্যায় শুরু করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের। আর ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত মার্কিন ইতিহাসে অন্যতম উচ্চঝুঁকিপূর্ণ সামরিক জুয়া হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।