বালিয়াডাঙ্গী (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি: রমযান আরবী বৎসরের অষ্ঠম মাস। এই মাসের ফযীলতের সহিত বৎসরের অন্য কোন মাসের ফযীলতের তুলনা হয় না। ইহার ফযীলত অনেক বেশী।ইহাকে আল্লাহ তায়ালা খাস ফযীলত দান করিয়াছেন। এই মাসের যেকোনো এবাদতের সওয়াব অন্যান্য মাসের এবাদত অপেক্ষা ৭০ গুন বেশী। আল্লাহ তাআলা এই মাসে উম্মতে মুহাম্মদদী (সাঃ)-এর প্রতি ত্রিশটি রোযা ফরয করিয়াছেন। কোরআন মাজীদে এরশাদ হইয়াছে:
ইয়া আইয়্যুহাল্লাযীনা আমানূ কুতিবা আলাইকুমুসসসিয়ামা কামা কুতিবা আলাল্লাযীনা মিন কাবলিকুম লাআল্লাকুম তাত্তাকূন
অর্থ : হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রমযান মাসের রোযা ফরয করা হইয়াছে, যে রূপ তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরয করা হইয়াছিল, যেন তোমার আল্লাহকে ভয় কর।
রমযান মাসে প্রতিদিন রোযা আদায়কারীদের দুই দুইটি করিয়া ফরয আদায় হয়, একটি ফরয রোযার এবং অন্যটি রোযার নিয়তের । রোযা মানুষের পাপরাশি জ্বালাইয়া-পোড়াইয়া নিঃশেষ করিয়া দেয় এবং দেহ কাঠামোকে পাপমুক্ত ও পবিত্র করে । এই প্রসঙ্গে রাসূল করীম (সাঃ) এরশাদ ফরমাইয়াছেন:-
মান সামা রামাদান ঈমানাও ওয়া ইহতিসাবান খারাজা মিন যুনূবিহী কাহওয়ামিন ওয়ালাদাতহু উম্মুহু। ওয়া ফী রেওয়ায়াতিন মান সামা রামাদানা আওয়ালাহু ইলা আখিরিহী খারাজ মিন যুনূবিহী কাইয়াওমিন ওয়ালাদাতহু উম্মুহু।
{ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হইতে বর্ণিত, রাসূলে কারীম (সাঃ) এরশাদ করিয়াছেন}, যে ব্যক্তি রমযান মাসের প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত রোযা আদায় করে, সে নিজের গোনাহ সমূহ হইতে এমনভাবে বাহির হইয়া আসে যেন আজই তাহার মাতৃগর্ভ হইতে ভূমিষ্ঠ হইয়াছে। রমযান মাসের অধিক ফযীলতের আর একটি প্রধান কারণ, আল্লাহর বাণী পবিত্র কোরআন লাওহে মাহফুয হইতে প্রথম আসমানে এই মাসেই অবতীর্ণ হইয়াছিল।
রমযানের বৈশিষ্ট্য সমূহ -
বিভিন্ন কিতাবে বর্ণিত হইয়াছে, রমযানের কতগুলি বৈশিষ্ট্য আছে।
যেমন -
(১) রমযানে মানুষের রুজী বৃদ্ধি হয়।
(২) ধন-সম্পদ বৃদ্ধি পায়।
(৩) খাওয়া-দাওয়া সব কিছু এবাদতের মধ্যে গণ্য হয়।
(৪) নেক কাজ ও এবাদতের মাত্র বাড়ে।
(৫) আল্লাহর রহমত অত্যধিক প্রশস্ত হয়।
(৬) আসমান- যমীনের ফেরেশতাগণ রোজাদারের জন্য দোয়া করতে থাকে।
(৭) ইবলীস ও তার শিষ্যদেরকে বন্দী করে রাখা হয়।
(৮) নফসে আম্মারার জোর কমাইয়া দেওয়া হয়।
(৯) বেহেশতের দরজা সমূহ উন্মুক্ত রাখা হয়।
(১০) দোযখের দরজা সমূহ বন্ধ করিয়া দেওয়া হয়।
(১১) রোযাদারের জন্য প্রত্যহ বেহেশত সজ্জিত করা হয়।
(১২) রোযাদার ব্যক্তির দোয়া নিঃসন্দেহে কবুল হয়।
(১৩) রমযানের প্রতি শুক্রবার রাত্রে ঊনচল্লিশ লাখ জাহান্নামীকে মুক্ত করা হয়।
(১৪) রমযানের ভোর রাত্রে গোনাহগারদের গোনাহ মার্জনা করিয়া দেওয়া হয়।
(১৫) রোজাদারের দেহ পাপ মুক্ত হয়।
(১৬) রোজাদারের মন পবিত্র হয়।
(১৭) রমযানের এবাদতে অন্য সময়ের এবাদত অপেক্ষা ৭০ গুন বেশী সওয়াব হয়।
(১৮) আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টিলাভ সহজ হয়।
(১৯) রমযান মাসের পানাহারের হিসাব লওয়া হইবে না।
(২০) রমযানের রোযা মানুষকে পাপ কাজ হইতে বিরত রাখে।
রমযান মাসের চারটি বিশেষ ফযীলত--
হযরত ওমর (রাঃ) বলেন, আমি একদা রাসূলে কারীম (সাঃ) এর সমীপে রমযান শরীফের ফযীলত সম্পর্কে আরজ করিয়াছিলাম, তখন তিনি এরশাদ করিলেন, চারটি কিতাবে রমযানের চারটি পরিচয় বর্ণিত হইয়াছে। যথা:-
(১) তাওরাতে রমযানকে বলা হইয়াছে 'হাত্ব'-ইহার অর্থ, গোনাহ ধ্বংস করা।
(২) যাবুরে বলা হইয়াছে 'কোরাবত'-ইহার অর্থ, রমযান মাসে আল্লাহ তায়ালা সহিত বান্দার অত্যন্ত নৈকট্য লাভ হয়।
(৩) ইঞ্জীলে ইহার পরিচয়ে বলা হইয়াছে 'ত্বাব'-ইহার অর্থ পবিত্র হওয়া। অর্থাৎ, এই মাসে রোযাদারগণ পাপ হইতে পবিত্র হইয়া যায়।
(৪) আর পবিত্র কোরআনে ইহাকে বলা হইয়াছে 'রামাযান'। এই শব্দটি 'রময' ধাতু হইতে নিষ্পন্ন হইয়াছে। ইহার অর্থ হেমন্তকালীন বৃষ্টি বা জ্বালাইয়া দেওয়া। অর্থাৎ, রমযান মানুষের কু-রিপুসমূহকে জ্বালাইয়া ফেলে অথবা হেমন্তকালীন বৃষ্টি যেমন তরুলতাকে সজীব করিয়া তোলে, তেমনি রমযান আগমনে বান্দাগণও সর্ববিষয়ে আল্লাহর রহমতলাভে মৃত্যুতুল্য পাপ হইতে সজীব হইয়া উঠে।
রোযার তিনটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রহিয়াছে--
(১) রোযা মন এবং আত্মা উভয়কে আল্লাহর স্মরণের দিকে ঝুঁকাইয়া রাখে।
(২) রোযাদারকে বিবেক-বুদ্ধির বিপরীত কাজ হইতে বিরত রাখে।
(৩) নফসে আম্মারা অর্থাৎ কুরিপুর তাড়না তথা পানাহার সঙ্গমাদি হইতে ধৈর্যধারণের শিক্ষা দেয়।
সেহেরীর ফযীলত ---
রমযান মাসে সেহেরী খাওয়াতে অত্যধিক ফযীলত রহিয়াছে। হাদীস শরীফে এ বিষয়ে উল্লেখ আছে।
এই প্রসঙ্গে রাসূলে কারীম (সাঃ) এরশাদ ফরমাইয়াছেন, রোযা রাখার নিয়তে যে ব্যক্তি সেহেরী খাইবে, আল্লাহ্ তায়ালা তাহার প্রতি লোকমায় এক বৎসরের এবাদতের সওয়াব দান করিবেন। তিনি আরোও ফরমাইয়াছেন, হে রোযাদারগণ ! তোমার সেহেরী খাও, কেয়ামতে এই খানার কোনোরূপ হিসাব দিতে হইবে না।
আর এক হাদীসে রাসূলে কারীম (সাঃ) এরশাদ ফরমাইয়াছেন, তোমারা ইহুদীদের বিরোধিতার উদ্দেশে সেহেরী খাও। তাহারা, রোযা রাখে কিন্তু সেহেরী খায় না। যে রোযাদার সেহেরী খাইবে, তাহার আমলনামায় ইহুদীদের সংখ্যা পরিমাণ এবাদতের সওয়াব লিখা হইবে।
রাসূলে কারীম (সাঃ) আরোও ফরমাইয়াছেন, যে ব্যক্তি ইচ্ছাপূর্বক সেহেরী খাওয়া পরিত্যাগ করিবে, তাহার স্বভাব উহাদের (ইহুদীদের) মত হইবে।
সেহরীর নিয়ত অন্ততপক্ষে এক লোকমা খাইলেও তাহাকে অফুরন্ত সওয়াব দান করা হইবে।
হাদীস শরীফে আরও বর্ণিত আছে, সেহেরী খাইতে উঠিয়া (ইয়া ওয়াসেআল মাগফিরাত ) এসেমটি পাঠ করিলে অসংখ্য নেকী হাসিল হয়।
ইফতারের ফযীলত ----
রোযার ইফতারেও বহু ফযীলত নিহিত রয়েছে।রোযদারগণ যখন ইফতারী সম্মুখে লইয়া নির্দিষ্ট সময়ের অপেক্ষা করিতে থাকে, তখন আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন অত্যন্ত গর্বসহকারে ফেরেশতাগণকে ডাকিয়া বলেন, তোমরা দেখ তো, আমার বান্দাগণ শুধু আমার হুকুম তালিম করার জন্যই অতিশয় ক্ষুধা-পিপাসা সত্ত্বেও কিছুই মুখে দিতেছে না। আমার এমন অনুগত বান্দা সৃষ্টি করিতেই তো তোমরা আমাকে বারণ করিয়াছিলে। ইফতারের ফযীলত সম্পর্কে রাসূলে কারীম (সাঃ) এরশাদ ফরমাইয়াছেন:-
যে ব্যক্তি রোযাদারকে খেজুর, পানির সরবত বা এক ঢোক দুধ দ্বারা ইফতার করায়, তাহার জন্য রমযান মাসের প্রথম ভাগে খোদার রহমত, মধ্যম ভাগে ক্ষমা এবং শেষ ভাগে দোযখ হইতে মুক্তি রহিয়াছে।
এক হাদীসে আছে:-
মান আফতারা ফীতি সায়েমান কামা মাগফিরাতাল লিযযুহবি ওয়া ইতকুম মিনান নারি বিরাহমাতিল্লাহি
অর্থ:- রমযান মাসে কোন রোযাদারকে যে ব্যক্তি ইফতার করায় সে তাহার সমস্ত গোনাহ ইতে নিস্তার পায় এবং আল্লাহর রহমতে দোযখের আগুন হইতে মুক্তি লাভ করে।
তারাবীহ নামাযের ফযীলত --
রমযান মাসে এশার নামাযের পরে বেতেরের পূর্বে দশ সালামে বিশ রাকায়াত তারাবীর নামায আদায় করিতে হয়। এই নামায সুন্নতে মোআক্কাদা।এই নামাযে কোরআন শরীফ খতম করিলে অশেষ সওয়াব হয়। হযরত রাসূলে কারীম (সাঃ) স্বয়ং এবং সাহাবায়ে কেরাম তারাবীর নামায আদায় করিতেন।
রাসূলে কারীম (সাঃ) এর যমানায় এক সময় দেখা গেল, তারাবীর নামাযের সময় মসজিদ একেবারে পরিপূর্ণ হইয়া যাইতেছে। তখন কয়েকদিনের জন্য তিনি এই নামায হইতে বিরত রহিলেন। এ বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেন, যে অবস্থা দেখা যাইতেছে তাহাতে আমার ভয় হইতেছে, যদি আমি সর্বদা এই নামায আদায় করি তবে হয়ত ইহা আমার উম্মতের উপর ফরয হইয়া যাইবে। অবশ্য নবী করীম (সাঃ) তারপরেও তারাবীর নামায আদায় করিয়াছেন, কিন্তু একাধারে নহে।
সাহাবীদের মধ্যে বিশেষত হযরত ওমর (রাঃ) এর যমানায় প্রত্যহ নিয়মিতভাবে এই নামাযের জামাআত হইত। তিনি তারাবীর জন্য বিশেষ তাম্বিহ-তাকিদ করিতেন। তিনি এইরূপ বলিতেন, যে ব্যক্তি রাসূলে কারীম (সাঃ) এর সুন্নত হইতে বিরত থাকিবে, আমি তাহার গৃহ তল্লাশি করিব।
প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলে কারীম (সাঃ) কে বলিতে শুনিয়াছি, আসমানে ' হাযীরাতুল কুদস ' নামে নূরের একটি জায়গা আছে। সেই জায়গা হইতে আল্লাহ তায়ালা তারাবীর নামায আদায়কারীদিগকে অবলোকন করেন।
হযরত আলী (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, খলীফা ওমর (রাঃ) এর যমানায় তারাবীর নামাযের সময় মসজিদ একেবারে পরিপূর্ণ হইয়া যাইত।
হযরত ওসমান (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে, একদা হযরত আলী (রাঃ) মসজিদে গিয়া দেখিলেন, তারাবীর নামায উপলক্ষে মসজিদ মোমবাতির আলোকে আলোকিত হইয়া গিয়াছে। তখন তিনি বলিলেন, আল্লাহ তায়ালা হযরত ওমর (রাঃ) এর কবরকে নূর দ্বারা আলোকিত করুন। তিনিই তারাবীর নামাযের ব্যবস্থা দ্বারা এই মসজিদ আলোকিত করিয়াছেন।হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) হইতেও এইরূপ বর্ণিত আছে।
হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, রাসূলে কারীম (সাঃ) এরশাদ ফরমাইয়াছেন, যে এশার চারি রাকাআত ফরয ও দুই রাকাআত সুন্নতের পরে এবং তিন রাকাআত বেতের নামাযের পূর্বে তারাবীর নামায আদায় করিবে, তাহার গোনাহসমূহ দূরীভূত হইয়া যাইবে। বিভিন্ন কিতাবে বুযুর্গানে দ্বীন হইতে উল্লেখ করা হইয়িছে, রমযান মাসে তারাবীর নামাযের এত গুরুত্ব যে, উহা আদায় না করিলে রোযাদারগণ রোযার পূর্ণ সওয়াব লাভে বঞ্চিত হয়।