শাহজালাল শ্রাবণ, গঙ্গাচড়া (রংপুর)
অভাব, অনিশ্চয়তা আর জীবনের নির্মম বাস্তবতা–সবকিছুকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার গল্পগুলোই একদিন হয়ে ওঠে অনুপ্রেরণা। তেমনই এক গল্প মেধাবী শিক্ষার্থী মোস্তাফিজার রহমানের। গতকালও জীবিকার তাগিদে পথে পথে ডেলিভারি রাইডার, আজ তিনি স্বপ্নের ক্যাম্পাস রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন শিক্ষার্থী।
২০২১ সালের এক ভয়াল রাত তার জীবনে নেমে আনে অন্ধকার। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় হারান বাবাকে। সেই অল্প বয়সেই কাঁধে এসে পড়ে পরিবারের দায়িত্ব। অভাব তখন আর শুধু শব্দ নয়, প্রতিদিনের বাস্তবতা। তবুও থেমে যাননি মোস্তাফিজার। প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে, রাত জেগে পড়াশোনা করে এগিয়ে গেছেন নিজের স্বপ্নের পথে।
ভর্তি পরীক্ষার পর জীবিকার প্রয়োজনে নামতে হয় কর্মজীবনে। যোগ দেন স্টেডফাস্ট কুরিয়ার সার্ভিস লিমিটেডে ডেলিভারি রাইডার হিসেবে। পাবনার সুজানগর উপজেলার একটি হাবে কাজ শুরু করেন। কিন্তু তার একার আয় দিয়ে পরিবার চালানো ছিল কঠিন। প্রতিদিনের ক্লান্তি আর অনিশ্চয়তার মধ্যেও তিনি লালন করেছেন একটিই স্বপ্ন-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার।
এরই মধ্যে একদিন মুঠোফোনে আসে একটি ক্ষুদেবার্তা। সেই বার্তাই বদলে দেয় তার জীবনের গতিপথ। ভর্তি পরীক্ষায় ৮৩০তম স্থান অর্জন করে সুযোগ পান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রপ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগে ভর্তি হওয়ার।
এই পথচলায় একা ছিলেন না মোস্তাফিজার। পাশে দাঁড়িয়েছে তার কর্মস্থল স্টেডফাস্ট কুরিয়ার সার্ভিস লিমিটেড। গত শুক্রবার (২ এপ্রিল) বিকেলে পাবনার সুজানগর হাবে তার ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করতে আর্থিক সহায়তা দেয় প্রতিষ্ঠানটি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন পাবনা জোনাল ম্যানেজার মো. সালমান ফারসি, হাব ম্যানেজার মো. সেরাজুল ইসলাম ও মো. আব্দুল হালিম। টিম জিয়নের প্রতিনিধি জালাল আহমেদ রিয়েলের দিকনির্দেশনাও ছিল তার পথচলায় সহায়ক।
মোস্তাফিজার রহমান বলেন, এক দীর্ঘ সংগ্রামের পর আজ স্বপ্নের রাজপথে দাঁড়িয়ে আছি। জীবনের প্রতিটি ধাপে আসা প্রতিকূলতাকে জয় করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছি।
তিনি জানান, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় বড় বোনের চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে পরিবার প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়ে। পরে বাবা প্রবাসে গেলেও সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এসএসসিতে জিপিএ–৫ অর্জন করলেও অর্থাভাবে রংপুর সরকারি কলেজে ভর্তি হতে পারেননি। পরে নিজ এলাকার কৈমারী স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়াশোনা চালিয়ে যান।
২০২১ সালে বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের ওপর নেমে আসে আরও কঠিন বাস্তবতা। এইচএসসিতে ৪.৬৭ পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির খরচ জোগাতে গিয়ে পরিবার ঋণের বোঝা বাড়ে। বর্তমানে জীবিকার তাগিদে পাবনার সুজানগর হাবে ‘ব্যাকআপ রাইডার’ হিসেবে কাজ করছেন তিনি।
মোস্তাফিজার বলেন, আজকের এই সাফল্য আমার বাবার জন্য, যিনি পাশে না থাকলেও স্বপ্ন দেখাতে শিখিয়েছেন। মা ও ছোট ভাইকে নিয়ে আমাদের ছোট পরিবারটির মুখে হাসি ফোটাতে চাই। সবার কাছে দোয়া চাই, যেন এই স্বপ্নের মর্যাদা রাখতে পারি।
তিনি ভর্তি–যাত্রায় সহযোগিতা ও মনোবল জোগানোর জন্য স্টেডফাস্ট কুরিয়ার সার্ভিস লিমিটেড ও টিম জিয়নের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
স্টেডফাস্ট কুরিয়ার সার্ভিস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেএম রিদওয়ানুল বারী জিয়ন বলেন, মোস্তাফিজারের গল্প কেবল একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত সাফল্যের কাহিনি নয়; এটি সংগ্রাম, সাহস এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অনন্য প্রতিচ্ছবি–যেখানে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়, আর বিজয়ী হয় স্বপ্ন। তিনি আরও বলেন, মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা সব সময় পাশে থাকবো।
নিউজ ডেস্ক
