ঢাকা

ধর্ষণ মামলা থেকে অব্যাহতি পেলেন সেই ইমাম

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ছবি : সংগৃহীত ছবি : সংগৃহীত

ঘটনাটি ফেনীর সীমান্তবর্তী উপজেলা পরশুরামের। এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে গ্রামের এক ইমামের বিরুদ্ধে। অভিযোগের পরপরই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর এক মাসেরও বেশি সময় তাকে কারাভোগ করতে হয়।

ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিকভাবে চরম অপমানের মুখোমুখি হতে হয় তাকে। একইসঙ্গে হারাতে হয় চাকরিও।
কিন্তু দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর সামনে আসে এক ভয়ংকর সত্য। কিশোরীর গর্ভের সন্তানের ডিএনএ পরীক্ষায় জানা যায়, শিশুটির বাবা ওই ইমাম নন; বরং মেয়েটিরই বড় ভাই।

পরে পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে ভাই নিজেই বোনকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেন।
ফরেনসিক পরীক্ষায় পরশুরামের বক্সমাহমুদে ধর্ষণের শিকার সেই কিশোরীর ভূমিষ্ট সন্তানের সঙ্গে তার বড় ভাইয়ের ডিএনএর মিল পাওয়া গেছে। আর এই অপরাধের দায় থেকে ভাইকে বাঁচাতে ফাঁসানো হয়েছিল স্থানীয় এক মসজিদের ইমাম মোজাফফর আহমদকে। ১ মাস দুই দিন কারাভোগের পর ধর্ষণ মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন তিনি।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর ওই গ্রামের চান মিয়ার স্ত্রী হনুফা খাতুন তার কিশোরী কন্যা রুবি আক্তারকে (১৪) ধর্ষণের অভিযোগে একই গ্রামের স্থানীয় জামে মসজিদের ইমাম ও মক্তবের শিক্ষক মোজাফফরের বিরুদ্ধে পরশুরাম মডেল থানায় মামলা করেন। নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও মোজাফফর আহমদ কোনো ছাড় পাননি। অভিযোগকে মিথ্যা উল্লেখ করে তিনি ওই পরিবারের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর ফেনীর আদালতে মামলা করতে যান। এ সময় আদালত প্রাঙ্গণ থেকেই গ্রামের কয়েকজন মাতব্বর ও হনুফা খাতুন তাকে জোরপূর্বক পুলিশের হাতে তুলে দেন। পরে তিনি এক মাস দুই দিন কারাভোগ করেন।

২০১৯ সালে মক্তবের পাঠ শেষ করে পরশুরামের বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের উত্তর টেটেশ্বর গ্রামের কিশোরী রুবি আক্তার। এরপর প্রায় পাঁচ বছর পর সে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে একটি সন্তানের জন্ম দেয়। আর এর দায় চাপানো হয় ওই মক্তবের শিক্ষক মোজাফফর আহমদের ওপর।


একই বছরের ২২ ডিসেম্বর অভিযুক্ত মোজাফফর আহমদকে ঢাকার মালিবাগে সিআইডি বিভাগের ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য স্বশরীরে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে রুবি আক্তারের সংরক্ষিত ভ্যাজাইনাল সোয়াবও পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়।

পরে ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি ঢাকার মালিবাগ ফরেনসিক ল্যাবরেটরি থেকে ডিএনএ প্রতিবেদন গ্রহণ করেন পরশুরাম মডেল থানার উপ-পরিদর্শক জাহিদুল ইসলাম।

ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভ্যাজাইনাল সোয়াবে পুরুষের বীর্যের কোনো উপাদান শনাক্ত হয়নি। ফলে ওই নমুনায় বীর্য না থাকায় মোজাফফরের ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে তুলনা করে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

এ অবস্থায় কিশোরী রুবি আক্তার ও তার সদ্য ভূমিষ্ঠ কন্যাসন্তানের জৈবিক পিতা নির্ধারণের জন্য ডিএনএ পরীক্ষার উদ্দেশ্যে তাদের পরীক্ষাগারে উপস্থিত হয়ে নমুনা প্রদানের আবেদন আদালতে করা হয়।

এরমধ্যে পুলিশের তদন্তে উঠে আসে বিস্ময়কর তথ্য। ডিএনএ রিপোর্টে কিশোরীর সন্তানের সঙ্গে মোজাফফরের ডিএনএ'র মিল না পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। কিশোরী রুবি আক্তারকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করলে এক পর্যায়ে ওই কিশোরী তার বড় ভাই মোরশেদ তাকে গণহারে ধর্ষণ করেছে বলে স্বীকারোক্তি দেয়। ঘটনা আড়াল করে ভাইকে বাঁচাতে শিক্ষক মোজাফফরকে ফাঁসানো হয়। পরে ২০২৫ সালের ১৯ মে বড় ভাই মোরশেদকে (২২) গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায় পুলিশ। আদালতে বোনকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করে ২০ মে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী প্রদান করে মোরশেদ।

আদালতের আদেশের পর রুবি আক্তার, তার ভূমিষ্ঠ কন্যা জান্নাতুল ফেরদাউস এবং বড় ভাই মোরশেদের ডিএনএ পরীক্ষার জন্য একই বছরের ৪ আগস্ট ঢাকার পুলিশের ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়। পরে ৯ আগস্ট প্রকাশিত ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শিশু জান্নাতুল ফেরদাউসের সঙ্গে মোরশেদের জেনেটিক মিল পাওয়া গেছে। ভিকটিমের সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়ার শিশু কন্যা জান্নাতুল ফেরদাউসের সঙ্গে মোরশেদের ডিএনএ নমুনা মিলে যাওয়ায় তিনি তার জৈবিক পিতা। ডিএনএ পরীক্ষক মো. জাহিদুল ইসলাম ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ডিএনএ পরীক্ষায় মোরশেদের সঙ্গে জান্নাতুল ফেরদৌসের পিতা হিসেবে ৯৯.৯৯ শতাংশ মিল রয়েছে। মোজাফফর আহমেদ রুবি আক্তারের গর্ভজাত সন্তানের জৈবিক পিতা নন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক শরীফ হোসেন জানান, অভিযোগপত্রে মোজাফফর আহমেদের বিরুদ্ধে আনিত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত) এর ৯(১) ধারায় অপরাধ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে ধর্ষণ মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে মোরশেদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় একই আইনের অধীন তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। বর্তমানে মোরশেদ ফেনী জেলা কারাগারে রয়েছেন। আদালতে ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর এক মাস দুই দিন কারাভোগ শেষে মোজাফফর জামিনে মুক্তি পান।

পরশুরাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশ্রাফুল ইসলাম জানান, বিষয়টি নিয়ে পুলিশ গভীরভাবে তদন্ত করেছে। ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর চার্জশিট থেকে মোজাফফরের নাম প্রত্যাহার করা হয়। তিনি বলেন, নিরপরাধ একজনকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, যা সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

পরশুরামের বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের উত্তর টেটেশ্বর গ্রামের পশ্চিমপাড়া জামে মসজিদের ইমাম ও মক্তবের শিক্ষক ছিলেন মোজাফফর আহমদ। এ ঘটনার পর তিনি মসজিদের ইমামতি এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাকরি হারান। মামলার খরচ বহন করতে গিয়ে নিজের ৫ শতক জমি বিক্রি করতে বাধ্য হন তিনি। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে সামাজিকভাবে হেনস্থার শিকার হয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। তিনি ওই গ্রামের আবুল বশরের ছেলে।

মোজাফফর আহমদ বলেন, “অবশেষে সত্যের জয় হয়েছে। এই ঘটনায় আমি সামাজিক ও পারিবারিকভাবে হেনস্থার শিকার হয়েছি। চাকরি হারিয়েছি, আর মামলার খরচ চালাতে জমি বিক্রি করতে হয়েছে। আমি আর্থিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।” তিনি আরও বলেন, “প্রায়ই দেখা যায় মসজিদের ইমাম ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের অপবাদ দিয়ে ফাঁসানো হয়। প্রকৃত সত্য বের হলে আমার মতো অনেক নিরপরাধ মানুষ রক্ষা পাবে।” তিনি সামাজিক মর্যাদাহানি ও কারাভোগের জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করেন।

তার আইনজীবী আবদুল আলিম মাকসুদ বলেন, “এ ধরনের ঘটনা বিরল। তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হয়েছে।”

জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের পরশুরাম উপজেলার সাধারণ সম্পাদক মুফতি আমিনুল ইসলাম বলেন, “তিনি একজন মজলুম ইমাম ও তালেবে ইলম। তার সামাজিক মর্যাদাহানি হয়েছে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত ইমামের যথাযথ ক্ষতিপূরণ এবং আইনি ও আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন।”






কমেন্ট বক্স