তেজগাঁও কলেজের ইসলামিক ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মোজাহিদুল ইসলামের সকাল শুরু হত পড়াশোনা আর শিক্ষকের সাথে কুশল বিনিময়ের স্বাভাবিক ব্যস্ততা দিয়ে। রাজনীতির সাথে যার কোনো যোগসূত্র নেই, সেই মোজাহিদের এখন হাতে হাতকড়া আর কপালে জুটেছে ‘রাজনৈতিক তকমা’। আদালতের বারান্দায় ঘুরছেন মামলার বোঝা নিয়ে। শুধুমাত্র পুলিশের অপরিপক্ক তদন্ত এবং যাচাই-বাছাই ছাড়া মামলার কারণে দীর্ঘ এক মাস কারাবরণ এবং ৬ লক্ষ টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন এই শিক্ষার্থী।
২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর। তেজগাঁও কলেজের ইসলামি ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের মেধাবী ছাত্র মোজাহিদুল ইসলাম তার শিক্ষক ড. জাহারাবী রিপন স্যারের সাথে দেখা করতে যাচ্ছিলেন। পথে স্কুল জীবনের এক বড় ভাই আলভীর ফোন আসে। সেই বড় ভাইয়ের সাথে সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎ করতে মোহাম্মদপুরের আসাদ গেট আড়ং-এর সামনে যান মোজাহিদ। চা-মিষ্টি খাওয়া শেষে ফেরার পথে হঠাৎ পুলিশ তাদের দুজনকে গ্রেফতার করে।
মোজাহিদের অপরাধ? তার সাথে থাকা ওই বড় ভাই ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। অথচ মোজাহিদ নিজে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রাথমিক সদস্যও নন।
মোজাহিদের ভাষ্যমতে, গ্রেফতারের পর পুলিশ তার কোনো কথা শোনেনি। নিজের ছাত্রত্বের প্রমাণ দিলেও এবং ফোনে কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা না পেলেও তাকে অন্য ৫-৬ জনের সাথে অজ্ঞাতনামা আসামী হিসেবে চালান করে দেওয়া হয়। পুলিশের এই ‘গণ-মামলা’ এবং যাচাই-বাছাইহীন চার্জশিট একজন সাধারণ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
গ্রেফতারের পর দীর্ঘ এক মাস কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারে সাধারণ হাজতে কাটাতে হয় মোজাহিদকে। যেখানে অপরাধীদের সাথে দিনাতিপাত করতে হয়েছে একজন নিরপরাধ শিক্ষার্থীকে। এরপর দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০২৬ সালের ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসের দিনে তিনি জামিনে মুক্তি পান।
মোজাহিদুল ইসলামের পরিবার জানায়, এই সাজানো মামলা থেকে ছেলেকে মুক্ত করতে গিয়ে তাদের প্রায় ৬ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়েছে। মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এই অর্থ যোগাড় করা ছিল এক পাহাড়সম কষ্ট। শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, সামাজিকভাবে মোজাহিদ যে মানহানির শিকার হয়েছেন, তার কোনো ক্ষতিপূরণ নেই।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা উত্তাল পরিস্থিতিতে পুলিশের এমন ‘পাইকারি’ গ্রেফতার এবং তদন্ত ছাড়া মামলা দেওয়ার সংস্কৃতি আইনের শাসনের পরিপন্থী। মোজাহিদের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। জামিনে মুক্তি পেলেও মামলা থেকে এখনো নিষ্কৃতি মেলেনি তার। এখনো পড়াশোনা ফেলে নিয়মিত তাকে কোর্টে হাজিরা দিতে হচ্ছে।
আইনের কাজ অপরাধীকে ধরা, কিন্তু নিরপরাধ কেউ যেন প্রতিহিংসা বা ভুল তদন্তের শিকার না হয়, সেটি নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। মোজাহিদের ঘটনা প্রমাণ করে, মামলা দেওয়ার আগে যথাযথ যাচাই-বাছাই কতটা জরুরি।
অত্যন্ত নম্র ও ভদ্র হিসেবে পরিচিত মোজাহিদুল ইসলাম বলেন, "আমি কোনো রাজনীতি করি না, সাধারণ একজন ছাত্র। শুধুমাত্র একজনের সাথে দেখা করতে গিয়ে আমার জীবনটা তছনছ হয়ে গেল। আমি এই সাজানো মামলা থেকে পূর্ণ মুক্তি চাই এবং প্রশাসনের কাছে সুষ্ঠু বিচার চাই।"
পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার বদলে তার সময় কাটছে আইনি মারপ্যাঁচে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—তদন্তের এই গাফিলতি এবং সাজানো মামলার দায়ভার আসলে কার?
একজন সাধারণ শিক্ষার্থীর জীবন এভাবে আইনি গ্যাঁড়াকলে পিষ্ট হওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বইছে সমালোচনার ঝড়। প্রশ্ন উঠছে, তদন্তের আগেই একজন নিরপরাধকে জেল খাটানোর দায়ভার কে নেবে?