নোবিপ্রবি প্রতিনিধি: নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) কৃষি বিভাগের গবেষণা মাঠে একের পর এক চুরির ঘটনায় চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্টদের মাঝে। গবেষণার জন্য বিশেষভাবে চাষকৃত বিভিন্ন শস্য, সবজি ও মূল্যবান গবেষণা উপকরণ নিয়মিত চুরি হয়ে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে চলমান গবেষণা কার্যক্রম, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক অগ্রগতিকে হুমকির মুখে ফেলছে।
সর্বশেষ ঘটনায় বিভাগের এক অধ্যাপকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত গবেষণা প্রকল্পের আওতায় রোপণ করা বিভিন্ন জাতের মরিচ গাছ ও ফল সম্পূর্ণভাবে চুরি হয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এসব মরিচ ছিল গবেষণার জন্য নির্বাচিত উন্নত ও ভিন্নধর্মী জাত, যেগুলোর বৃদ্ধি, ফলন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং পরিবেশগত অভিযোজন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছিল। হঠাৎ করেই এই ফসল উধাও হয়ে যাওয়ায় পুরো গবেষণাটি কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে।
শুধু এই একটি ঘটনাই নয়—গত কয়েক মাস ধরে গবেষণা মাঠের বিভিন্ন প্লট থেকে ধান, শাকসবজি, ফলদ গাছের চারা এবং অন্যান্য গবেষণাসামগ্রী চুরির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে গবেষণার মাঝপথে ফসল হারিয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থী ও গবেষকদের বাধ্য হয়ে পুনরায় শুরু করতে হচ্ছে পুরো প্রক্রিয়া, যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।
উদ্বেগ প্রকাশ করে কৃষি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মেহেদী হাসান রুবেল বলেন, “গবেষণা একটি ধৈর্য ও পরিকল্পনার বিষয়। আমরা নির্দিষ্ট সময় ধরে ডাটা সংগ্রহ করি। কিন্তু যখন মাঝপথে ফসল চুরি হয়ে যায়, তখন শুধু গাছটাই হারাই না, আমাদের কয়েক মাসের পরিশ্রম, ডাটা এবং গবেষণার ধারাবাহিকতাও নষ্ট হয়ে যায়। আর একবার একটি সিজন শেষ হয়ে গেলে পুনরায় গবেষণা শুরু করতে আমাদের পুরো এক বছর অপেক্ষা করতে হয়।”
এছাড়া কৃষি বিভাগের শিক্ষার্থীরাও বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। তাদের মতে, মাঠভিত্তিক গবেষণা কৃষি শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এদিকে, গবেষণা মাঠে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না থাকাকেই এই সমস্যার মূল কারণ হিসেবে দেখছেন তারা। মাঠে না আছে স্থায়ী প্রহরার ব্যবস্থা, না আছে পর্যাপ্ত নজরদারি এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা বাউন্ডারি না থাকার ফলে রাতের অন্ধকারকে কাজে লাগিয়ে দুর্বৃত্তরা সহজেই ফসল চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে বিভাগের শিক্ষার্থীরা।
গবেষণায় নিয়োজিত শিক্ষার্থী নাওরোজ আরাফাত বলেন,
“আমরা প্রতিদিন মাঠে গিয়ে গাছের বৃদ্ধি, রোগবালাই ও ফলনের তথ্য সংগ্রহ করি। কিন্তু হঠাৎ করে যখন দেখি পুরো প্লটটাই উধাও, তখন আমাদের মানসিকভাবে খুব হতাশ লাগে। নতুন করে শুরু করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।”
আরেক শিক্ষার্থী মাহমুদুল কবির নাঈম বলেন, “আমরা মাঠে কাজ করতে গিয়ে সবসময় এক ধরনের অনিশ্চয়তায় থাকি। কখন কোন প্লটের ফসল হারিয়ে যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। একটি গবেষণার পেছনে অনেক সময়, শ্রম ও পরিকল্পনা থাকে। ফসল চুরি হয়ে গেলে শুধু গবেষণাই নয়, আমাদের শেখার প্রক্রিয়াটাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা নিরাপদ পরিবেশ চাই, যেখানে নির্ভয়ে গবেষণা করতে পারবো।”
এই বিষয়ে কৃষি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড.গাজী মো: মহসিন বলেন “গবেষণা মাঠে ফসল চুরি হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অগ্রহণযোগ্য। আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মাসের পর মাস পরিশ্রম করে যে গবেষণাগুলো পরিচালনা করছেন, তা এভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বড় ক্ষতি। আমরা ইতোমধ্যে বিষয়টি প্রশাসনকে জানিয়েছি এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছি। একই সঙ্গে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, অন্য বিভাগের কিছু শিক্ষার্থী অসচেতনতার কারণে গবেষণা মাঠে প্রবেশ করে ফল বা ফুল ছিঁড়ে ফেলছে, যা গবেষণার জন্য ক্ষতিকর। এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি এবং গবেষণা মাঠের গুরুত্ব বিবেচনা করে সকলের দায়িত্বশীল আচরণ কাম্য।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রেজওয়ানুল হক বলেন,“গবেষণা মাঠে চুরির বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে এবং আমরা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। কৃষি বিভাগের গবেষণা কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তাই এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মাঠের আয়তন অনেক বড় হওয়ায় সম্পূর্ণ এলাকায় বাউন্ডারি দেওয়া বর্তমানে সম্ভব নয়। তবে বিকল্পভাবে নিরাপত্তা জোরদার করার বিষয়টি আমরা গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করছি।"
এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষক শিক্ষার্থীরা গবেষণা মাঠে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সিসিটিভি, বাউন্ডারি এবং নিয়ন্ত্রিত প্রবেশব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দৃশ্যমান উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি, নয়তো “গবেষণার মাঠ” ধীরে ধীরে ''চোরের টার্গেট স্পট'' এ পরিণত হওয়ার শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
নিউজ ডেস্ক