তেহরানে বসবাসকারী ত্রিশোর্ধ্ব ফ্রিল্যান্স ডিজাইনার আসল প্রায়ই বিদেশ থেকে কাজ পেতেন।কিন্তু প্রায় দুই মাস ইন্টারনেট ছাড়া থাকার পর তিনি সিএনএন-কে ফোনে বলেন, “কোনো নতুন প্রকল্প নেই, কোনো উত্তরও নেই। মনে হচ্ছে যেন সবকিছু রাতারাতি থেমে গেছে।”
কান্নাভেজা চোখে তিনি বলেন, তার আয় দিয়ে এখন আর মৌলিক খরচও মেটে না। তিনি এবং এই প্রতিবেদনের জন্য সিএনএন-এর সাথে কথা বলা অন্য ব্যক্তিরা গোপনীয়তার কারণে শুধু তাদের প্রথম নাম ব্যবহার করার অনুরোধ করেছেন।
আসল সেই কয়েক মিলিয়ন ইরানির একজন, যাদের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতটি অত্যন্ত ব্যক্তিগত একটি বিষয়। তারা তাদের কাজ হারিয়েছেন এবং দারিদ্র্যের দিকে ধাবিত হচ্ছেন।খুব কম খাতই এর থেকে রক্ষা পেয়েছে। সদ্য কর্মহীন হওয়া অগণিত মানুষের মধ্যে রয়েছেন তেল শোধনাগার ও বস্ত্র শ্রমিক, ট্রাক চালক, বিমানবালা এবং সাংবাদিকরা।সংঘাতের আগে থেকেই ইরানের অর্থনীতি শোচনীয় অবস্থায় ছিল। মুদ্রাস্ফীতি, দুর্নীতি এবং নিষেধাজ্ঞার কারণে মাথাপিছু জাতীয় আয় ২০১২ সালের প্রায় ৮,০০০ ডলার থেকে কমে ২০২৪ সালে ৫,০০০ ডলারে নেমে এসেছিল।পরিস্থিতি আরও খারাপ। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) অনুসারে, এই সংঘাতের কারণে আরও ৪১ লাখ পর্যন্ত মানুষ দারিদ্র্যের শিকার হতে পারে।
ইউএনডিপির তথ্যমতে, হাজার হাজার বিমান হামলায় সৃষ্ট ভৌত ক্ষয়ক্ষতির কারণে ব্যাপক হারে মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। সংবাদমাধ্যম ইকোইরান জানিয়েছে, ২৩ হাজারেরও বেশি কারখানা ও প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।এর ফলে সরাসরি দশ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নষ্ট হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইরানের শ্রম ও সামাজিক নিরাপত্তা উপমন্ত্রী গোলামহোসেন মোহাম্মদী। এবং এর পরোক্ষ প্রভাবে আরও দশ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে বলে অনুমান করেছে ইরানি প্রকাশনা এতমাদ অনলাইন।
বৈদেশিক নীতি বিষয়ক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক কুইন্সি ইনস্টিটিউটের হাদি কাহালজাদেহর মতে, জাহাজ চলাচল এবং ফলস্বরূপ আমদানিতে বিঘ্ন ঘটায় ইরানের আগে থেকেই ভঙ্গুর অর্থনীতি আরও বিপর্যস্ত হয়েছে, যা “ইরানের ৫০ শতাংশ চাকরিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে এবং জনসংখ্যার অতিরিক্ত ৫ শতাংশকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে।”
“যুদ্ধ, মুদ্রাস্ফীতি, মন্দা এবং চাহিদা হ্রাসের সম্মিলিত চাপে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম স্থগিত করেছে,” লিখেছেন কাহালজাদেহ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতির হার ৭২ শতাংশে পৌঁছেছে, তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে তা ছিল আরও অনেক বেশি।গত মাসে বিশাল পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সগুলোতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় হাজার হাজার শ্রমিক বিনা বেতনে ছুটিতে গেছেন। ইরানের বৃহত্তম ইস্পাত কারখানাগুলোও হামলার শিকার হয়েছে, কিন্তু তাদের মধ্যে দুটি—মোবারাকেহ স্টিল এবং খুজেস্তান স্টিল—কোনো কর্মী ছাঁটাই করার কথা অস্বীকার করেছে।
তবুও, ভারী শিল্পের ব্যাপক ক্ষতি পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। আজারবাইজান সীমান্তের কাছে সদর দফতর অবস্থিত ট্রেলার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মারাল সানাত ইস্পাতের অভাবে ১,৫০০ শ্রমিককে ছাঁটাই করেছে। ইরানের অন্যতম বৃহত্তম বস্ত্র প্রতিষ্ঠান বোরুজের্দ ৭০০ শ্রমিককে ছাঁটাই করেছে।
কুইন্সি ইনস্টিটিউটের কাহালজাদেহ বলেছেন, প্রয়োজনীয় প্যাকেজিং উপকরণের ঘাটতির কারণে অনেক দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা তাদের কার্যক্রম স্থগিত করেছে।
সিনিয়র ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট সোহেলা স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ফারারুকে বলেন , ২৮শে ফেব্রুয়ারি, “আমি একটি ফ্লাইটের জন্য বের হতে যাচ্ছিলাম, এমন সময় আমার সহকর্মী ফোন করে জানান যে সবকিছু বাতিল করা হয়েছে। মার্চ মাসে আমাদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, তাই ফ্লাইট পুনরায় চালু না হওয়া পর্যন্ত আমরা কোনো বেতন পাব না।”
দেশজুড়ে এবং বিভিন্ন শিল্পখাত জুড়ে এই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বেকারত্ব বীমার জন্য আবেদনকারীর সংখ্যায় হঠাৎ করে উল্লম্ফন ঘটেছে – গত দুই মাসে আবেদনকারীর সংখ্যা ১,৪৭,০০০, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি।
কাহালজাদেহর মতে , “এই বোঝা সবচেয়ে বেশি পড়ে অসংগঠিত খাতের কর্মী এবং প্রাতিষ্ঠানিক খাতের নিম্ন ও মধ্যম-দক্ষ কর্মীদের ওপর, যাদের সুরক্ষা ও রাজনৈতিক প্রভাব সবচেয়ে কম।”