সারা দেশে সাম্প্রতিক কয়েক দিনে বজ্রপাতে ৪০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। প্রতি বছরই মাঠে কাজ করা, মাছ ধরা বা খোলা জায়গায় অবস্থানের সময় বজ্রপাতে তিন শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতা বাড়ানো গেলে এ ধরনের মৃত্যু অনেকটাই কমানো সম্ভব হলেও বাস্তবে প্রাণহানি কমছে না, বরং বাড়ছে।
মার্চ থেকে মে—এই তিন মাস দেশে প্রাক-বর্ষার সময়, যখন মোট বজ্রঝড়ের প্রায় ৩৮ শতাংশ সংঘটিত হয়। এপ্রিল থেকে এর তীব্রতা বাড়তে শুরু করে এবং মে মাসে তা চূড়ায় পৌঁছায়। এ সময়ে গড়ে প্রায় ১৩ দিন বজ্রঝড় দেখা যায়, সঙ্গে থাকে দমকা হাওয়া ও শিলাবৃষ্টি।
আবহাওয়াবিদদের মতে, বজ্রপাত থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সতর্কতা। বজ্রধ্বনি শোনামাত্রই নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে হবে। আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক জানান, চলতি বছর মার্চ থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ধারাবাহিক বৃষ্টিপাত হয়েছে এবং মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এ প্রবণতা থাকতে পারে। ফলে বজ্রপাতের ঝুঁকিও অব্যাহত থাকবে।
বাংলাদেশে বজ্রপাত বেশি হওয়ার পেছনে ভৌগোলিক অবস্থান বড় কারণ। দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে আসা আর্দ্র বাতাস চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের পাহাড়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে উপরে উঠে ঠান্ডা হয়। একই সময়ে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাসের সঙ্গে সংঘর্ষে বজ্রমেঘ তৈরি হয়। ফলে সিলেট, সুনামগঞ্জ, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, পাবনা, রংপুর ও রাজশাহী অঞ্চলে বজ্রপাত বেশি হয়। বায়ুদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনও বজ্রপাত বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, একটি বজ্রঝড় সাধারণত আধা ঘণ্টা থেকে সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা স্থায়ী হয়। এ স্বল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটে। তাই প্রান্তিক কৃষক, জেলে এবং খোলা জায়গায় কাজ করা মানুষকে বজ্রমেঘ চেনা ও দ্রুত আশ্রয় নেওয়ার বিষয়ে সচেতন করা জরুরি।
আকাশে অস্বাভাবিক উঁচু ও দ্রুত বর্ধনশীল মেঘ দেখা গেলে তা বজ্রমেঘের লক্ষণ। এ ধরনের মেঘ দেখা মাত্রই নিরাপদ স্থানে চলে যেতে হবে। বজ্রপাতের আলো দেখার পর ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে শব্দ শোনা গেলে বুঝতে হবে ঝড় খুব কাছাকাছি। এ অবস্থায় অন্তত ৩০ মিনিট ঘরের ভেতরে অবস্থান করতে হবে।
আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, বজ্রধ্বনি শোনা মানেই ঝুঁকির মধ্যে থাকা। তাই দ্রুত ঘরে আশ্রয় নেওয়া জরুরি। তিনি খোলা মাঠ, গাছের নিচে বা জলাশয়ে অবস্থান না করার পরামর্শ দেন। বজ্রপাতের সময় বৈদ্যুতিক যন্ত্রের সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা, ধাতব বস্তু থেকে দূরে থাকা এবং জানালা-দরজা বন্ধ রাখারও পরামর্শ দেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার ক্রমেই বাড়ছে। ১৯৯০-এর দশকে বছরে গড়ে ৩০ জন মারা গেলেও বর্তমানে তা ৩০০ জনের বেশি। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
তাই বজ্রপাতের শব্দ শোনামাত্রই নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সচেতনতা ও সতর্কতাই পারে এই প্রাণহানি কমাতে।