রংপুরে বিএনপির একজন ইউনিয়ন নেতার বিরুদ্ধে নির্বাচনে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করার উপহার হিসেবে সরকারি কর্মসূচির ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেয়ার প্রলোভনে গৃহবধূকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে দল থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
ঘটনা তদন্তে নিজস্ব কমিটিও গঠন করেছে দলটি। এই ঘটনার পর এনামুল সপরিবারে এলাকা থেকে চলে গেছেন। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত আইনগত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি ভুক্তভোগী।
সাময়িক অব্যাহতি পাওয়া ওই নেতার নাম এনামুল হক। তিনি মিঠাপুকুর উপজেলার ভাংনি ইউনিয়ন বিএনপির সহ সাংগঠনিক সম্পাদক। তার বাড়ি কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলায়। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে প্রায় নয় বছর থেকে ওই এলাকার ঠাকুরবাড়িতে পারভিন আক্তার নামের এক গৃহবধুর বাড়িতে হারা থাকতেন তিনি। ওই এলাকায় রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন তিনি।
ভুক্তভোগী গৃহবধূ জানান, ‘আমি ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষের পক্ষ হয়ে এলাকায় কাজ করি। এ সময় স্থানীয় বিএনপি নেতা এনামুল মিস্ত্রি আমাদের বিভিন্নভাবে পরামর্শ দিয়ে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করান। তখন থেকে নেতা হিসেবে তার সাথে আমার ও আমার স্বামীর পরিচয়।
কয়েকদিন আগে এনামুল আমাদের বাড়িতে এসে বলেন, ধানের শীষে কাজ করার উপহার হিসেবে তোমাকে একটা ফ্যামিলি কার্ড দেয়া হবে। গত শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) এনামুল মিস্ত্রি আমার বাড়িতে আসেন এবং একটি মোবাইল নাম্বার চান। আমি তাকে পরে দিতে চাই। শনিবার (২৫ এপ্রিল) এনামুল মিস্ত্রি আবারও আমার বাড়িতে আসেন, আমার কাছে মোবাইল নাম্বার চাইলে আমি বের করতে না পারায় তাকে আমার মোবাইলটা দেই এবং সেভ করা নাম্বারটা নিতে বলি।
গৃহবধূ ও আরো অভিযোগ করে বলেন, ‘এনামুল মিস্ত্রি তখন মোবাইল নম্বর নিতে নিতে আমাকে বলে তোমার ফ্যামিলি কার্ড হয়ে যাবে। ঈদের পর থেকে তুমি টাকা পাবা। এরপর তিনি আমার দিকে খারাপ দৃষ্টিতে তাকান এবং শারীরিক সম্পর্ক করার প্রলোভন দেখান। ওই সময় বাড়িতে কেউ ছিল না। তখন আমি তাকে দ্রুত বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলি। এরপর আমি আমার টিউবওয়েলের পাড়ে গিয়ে কাপড় ধোয়া শুরু করি। তখন এনামুল মিস্ত্রি আমাকে পেছন দিক থেকে জাপটে ধরে ধর্ষণ করার চেষ্টা করে। আমি অত্যন্ত কৌশলে ধাক্কা দিয়ে কলেরপাড় থেকে পালিয়ে যাই এবং বিষয়টি আমার নিকটজনদের জানাই।’
এদিকে ঘটনার পর এনামুল বকেয়া বাড়ি ভাড়া পরিশোধ করে স্ত্রী সন্তানসহ এলাকা ছেড়েছেন।
এনামুলের বাড়ির ভাড়াটিয়া আক্তার জানান, ‘ঘটনার পর এলাকাবাসীর খুব চাপ ছিল। সে কারণে এনামুল তার স্ত্রী এবং সন্তানদের নিয়ে আমাদের বকেয়া ভাড়া পরিশোধ করে এলাকা থেকে চলে গেছেন। আমার বাড়িতে নয় বছর থেকে ভাড়া থাকতেন তিনি। প্রথমে এনামুল চলে যায় এবং মঙ্গলবার তার স্ত্রী সন্তান সহ বাড়ি ছেড়ে দিয়ে চলে গেছেন।’
এদিকে ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর এনামুল হককে দলীয় পদ পদবী থেকে সাময়িক অব্যাহতি দিয়েছে মিঠাপুকুর উপজেলা বিএনপি। এছাড়াও ভাংনি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মাহবুবুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক আবুল হোসেনের সমন্বয়ে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিক ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটির সদস্য ভাগ্নি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল হোসেন জানান, বিএনপির ভাবমূর্তি নষ্ট হয় এমন যেকোনো কাজের দায়ভার বিএনপি নেবে না। আমরা তদন্ত শুরু করেছি। কথা সময়ে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে উপজেলা বিএনপির কাছে পৌঁছে দেয়া হবে। আমরা এক্ষেত্রে কোনোভাবেই প্রভাবিত হবো না।
এদিকে অভিযোগ উঠায় দল থেকে অব্যাহতি পাওয়া বিএনপি নেতা এনামুল হক বলেন, ‘ঘটনাটি কোনোভাবেই ধর্ষণ চেষ্টা ছিল না। পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে আমি তার বাসায় গিয়েছিলাম। ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলেছিলাম। তবে তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করিনি। আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। ঘটনা যা না তা রটিয়ে আমাকে ভাড়া বাসা থেকে স্থানীয়রা চলে যেতে বাধ্য করেছেন।’
মিঠাপুকুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম রব্বানী জানান, ঘটনাটি প্রকাশ পাওয়ার সাথে সাথে আমরা তাকে দলীয় সকল পথ পদবী থেকে সাময়িক অব্যাহতি দিয়েছি। তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। তারা নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রতিবেদন দিলেই তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে নিয়ে কেউ কোনো ধরনের অরাজকতা তৈরির চেষ্টা করলে দল তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে।’
মিঠাপুকুর থানা ওসি মোহাম্মদ নুরুজ্জামান জানান, ঘটনাটি আমিও শুনেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কেউ আমাকে বা থানায় লিখিত বা মৌখিক মৌখিকভাবে জানাইনি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ভুক্তভোগীর অভিযোগ ছাড়া আমাদের করার কিছু থাকে না। অভিযোগ পেলেই যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
মামলা বা কোনো অভিযোগের বিষয়ে গৃহবধূর স্বামী জানান, ঘটনাটি খুবই আপত্তিকর। তবে ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর এনামুল সেলেন্ডার করেছে। আমাদের কাছে ক্ষমা চেয়েছে। অনুরোধ করেছে এই ধরনের কাজে আর সে লিপ্ত হবে না। সে কারণে আমরা বিষয়টা পর্যবেক্ষণ করছি। তাই এখন পর্যন্ত মামলা করা হয়নি। মামলা করা হলে আপনাকে জানানো হবে।
মিঠাপুকুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম রব্বানী বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘দুই সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদের আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশনা দেয়া হয়।’
মিঠাপুকুর থানার পুলিশ পরিদর্শক মো: নুরুজ্জামান বলেন, ‘কেউ অভিযোগ করেননি। অভিযোগ পেলে খতিয়ে দেখে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
ভাংনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লা আল ওয়াহেদী জানান, ‘ঘটনাটি তিনি শুনেছেন মাত্র। তবে ভুক্তভোগী লিখিত বা মৌখিকভাবে কোনো অভিযোগ করেনি। তবে এনামুল আমাকে ফোন করে জানিয়েছেন ‘ভাড়াটিয়া তাদের আর রাখতে চায় না। সে কারণে তিনি পরিবার পরিজন সহ বাসা ছেড়ে দিয়ে চলে গেছেন।’