ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে কি প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছে ন্যাটো? ন্যাটো নিয়ে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্পের হাতাশাজনক বক্তব্য এবং যুক্তরাষ্ট্র বেরিয়ে গেলে ন্যাটো কি করবে- ধরনের হুশিয়ারির পরও ইরান যুদ্ধে ন্যাটো অংশীদাররা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের পাশে না দাড়াঁনোয় নানা জল্পনা ছড়িয়ে পড়ছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতকে বোঝার জন্য অনেকের কাছে গেম থিওরির "চিকেন গেম" মডেল একটি কার্যকর বিশ্লেষণাত্মক কাঠামো। এই মডেলে দুই পক্ষই সংঘাতের দিকে এগিয়ে যায় (এস্কেলেট), কিন্তু যে আগে পিছু হটে (ডি-এস্কেলেট), তাকে দুর্বল বা পরাজিত হিসেবে দেখা হয়। তবে উভয় পক্ষই যদি পিছু না হটে, তাহলে ফলাফল হয় ভয়াবহ—একটি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ, যেখানে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান ঠিক এই ধরনের কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামনে দুটি প্রধান পথ—একদিকে সামরিক হামলা বাড়িয়ে চাপ সৃষ্টি করা, অন্যদিকে সীমিত আঘাতের মাধ্যমে আলোচনার সুযোগ খোলা রাখা। অপরদিকে ইরান সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে আঞ্চলিক প্রক্সি শক্তি—যেমন হিজবুল্লাহ বা হুথি—ব্যবহার করে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে, অথবা কৌশলগত ধৈর্য ধরে সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করতে পারে। এই কৌশলগুলোর পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ায় চারটি সম্ভাব্য ফলাফল তৈরি হয়: উভয় পক্ষের এস্কেলেশন হলে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ, একপক্ষ পিছু হটলে অন্যপক্ষের কৌশলগত লাভ, এবং উভয় পক্ষ পিছু হটলে একটি অস্থির শান্তি।
এই খেলায় ন্যাটো সরাসরি প্রধান খেলোয়াড় না হলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ “ভারসাম্য পরিবর্তনকারী”। ন্যাটো চাইলে যুক্তরাষ্ট্রকে পূর্ণ সমর্থন দিতে পারে, যা ইরানের ওপর চাপ বাড়াবে কিন্তু যুদ্ধকে বিস্তৃত করবে। আবার ইউরোপ যদি কৌশলগত নিরপেক্ষতা নেয়—যা সবচেয়ে সম্ভাব্য—তাহলে ন্যাটো ভাঙবে না, তবে দুর্বল ও বিভক্ত বলে মনে হবে। আর যদি ইউরোপ সরাসরি বিরোধিতা করে, তাহলে ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে জোটের ভিতরে ফাটল সৃষ্টি হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি "অপ্রত্যাশিত খেলোয়াড়" হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ। তার হঠাৎ সিদ্ধান্ত, যেমন দ্রুত মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি, পুরো গেমের অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দেয়। ফলে অন্য পক্ষগুলো তার পদক্ষেপ অনুমান করতে পারে না, যা সংঘাতকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
এছাড়া ইরান সরাসরি যুদ্ধের বদলে একটি "মাল্টি-লেভেল গেম" খেলছে—যেখানে লেবানন, ইয়েমেন, ইরাক ও সিরিয়ার প্রক্সি শক্তির মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করা হয়। ফলে সংঘাতটি শুধু সরাসরি যুদ্ধ নয়, বরং প্রক্সি যুদ্ধ, অর্থনৈতিক যুদ্ধ এবং কূটনৈতিক লড়াইয়ের সমন্বয়ে একটি জটিল রূপ নেয়।
সবচেয়ে সম্ভাব্য "ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম" বা স্থিতাবস্থা হলো—নিয়ন্ত্রিত সংঘাত। তবে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ভুল হিসাব । একটি বড় ধরনের হামলা বা অতিরিক্ত বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য ভেঙে দিতে পারে এবং পরিস্থিতিকে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ দিতে পারে।
সার্বিকভাবে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত একটি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ কৌশলগত খেলা, যেখানে ন্যাটো একটি ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি এবং ট্রাম্প একটি অনিশ্চয়তা সৃষ্টিকারী উপাদান। ফলে ন্যাটো ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা কম হলেও এটি দুর্বল ও বিভক্ত দেখাতে পারে, এবং বিশ্ব ধীরে ধীরে একটি “নিয়ন্ত্রিত বিশৃঙ্খলা”-এর দিকে অগ্রসর হতে পারে।
তবে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ভুল (ভুল হিসাব)। একটি বড় ধরনের বিকল্প বা বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য দিতে পারে এবং দ্রুত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ দিতে পারে।
-মাসুম খলিলি
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক