মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থির সময় চলছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্বের বহু দেশ আগেই তেলের দাম বাড়িয়েছে। বাংলাদেশে সরকার ঘোষণা দিয়েছিল, এপ্রিলে দাম বাড়ানো হবে না। তবে অনেকটা বাধ্য হয়ে দাম বাড়াতে হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিশ্ববাজারে দাম যে হারে বেড়েছে বা সরকার স্পট মার্কেট থেকে যে দরে তেল কিনছে, সেই অনুপাতে দাম বাড়ায়নি। পরিস্থিতি জটিল না হলে সরকার হয়তো আরও কিছুদিন আগের দামেই তেল বিক্রি করত। কারণ সরকারের কাছে ২৮ দিনের পুরোনো মজুত ছিল, যা আগের দামেই কেনা ছিল। তবে সেই মজুত এখন শেষের পথে। ফলে সরকারের কাছে সুযোগ ছিল, আরও কিছুদিন ভর্তুকি দিয়ে জনগণকে তেল সরবরাহ করা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ নতুন করে না বাড়ানোর।
তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে উদ্বেগের। তেলের দাম বাড়বে এবং সহজে পাওয়া যাবে না– এমন আশঙ্কায় জনগণের মধ্যে আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত ক্রয়ের প্রবণতা দেখা গেছে। পরিচিতদেরই দেখেছি, তারা তেল কিনে মজুত করছেন, যা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। একই সঙ্গে তারা অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়েছেন। নাগরিক হিসেবে সংকটের এই সময়ে সরকারকে সহায়তা করার নৈতিক দায়িত্ব আমরা পালন করিনি। উল্টো মজুত করে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছি এবং সরকারকে দাম বাড়াতে বাধ্য করেছি।
বর্তমানে স্পট মার্কেট বা গ্লোবাল মার্কেট থেকে যে তেল কেনা হচ্ছে, তা অনেক চড়া দামে সংগ্রহ করতে হয়েছে বা হচ্ছে। সরকারের রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। ফলে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দেওয়ার ক্ষমতাও কম। যে কারণেই হোক তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী এবং বহুমুখী। এর সরাসরি ফল হিসেবে দেশে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। প্রথমত পরিবহন ব্যয় বাড়বে। এর ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।
আমাদের অর্থনীতির প্রাণ কৃষি খাতও এর বাইরে নয়। বিশেষ করে সারের দাম বৃদ্ধি এবং সেচ ও পরিবহনের বাড়তি খরচ আগামী বোরো মৌসুমে উৎপাদন ব্যয় অনেকাংশে বাড়িয়ে দিতে পারে। মে থেকে আগস্ট এবং পরে নভেম্বর মাসে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব আরও প্রকট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে দেশের নিম্ন মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবার।
আগে থেকেই আমরা উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে আছি। নতুন করে যে চাপ তৈরি হবে, তা থেকে দরিদ্র মানুষকে সুরক্ষা দিতে ওএমএস এবং অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য খাদ্য সহায়তা বা নগদ অর্থ প্রদানের ব্যবস্থা রাখা জরুরি।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষকদের উৎপাদন যেন ব্যাহত না হয়, সেদিকে সর্বোচ্চ নজর দিতে হবে। সারের দাম এবং সেচের জন্য ডিজেল ভর্তুকি মূল্যে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কৃষক উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে এবং কৃষিতে আগ্রহ হারিয়ে না ফেলে। পাশাপাশি পরিবহন খাতে সিন্ডিকেট বা অতি মুনাফার প্রবণতা রোধে বাজার মনিটরিং প্রয়োজন। বাস ও ট্রাকের ভাড়া যেন যৌক্তিকভাবে নির্ধারিত হয় এবং তা কার্যকর থাকে, সে জন্য প্রতিযোগিতা কমিশনকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা দেশের জন্য সব সময়ের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর অন্যতম। অনেকে মনে করেন বিশালাকার তেল মজুত কেন্দ্র তৈরি করলেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। আমি এমনটা মনি করি না। কারণ এতে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ও দুর্নীতির ঝুঁকি থাকে। আমাদের এখন সময়োপযোগী প্রযুক্তির দিকে তাকাতে হবে। বড় ও বিলাসবহুল গাড়ি নিরুৎসাহিত করে ছোট গাড়ি এবং ‘ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল’ বা বৈদ্যুতিক বাসের প্রচলন বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য ও বিকল্প জ্বালানির প্রসারে দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, এটি একটি বৈশ্বিক সংকট। সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দরিদ্রবান্ধব নীতি গ্রহণ করতে পারলে আমরা সংকট সফলভাবে মোকাবিলা করতে পারব। তবে নাগরিকদের পক্ষ থেকেও দায়িত্বশীল আচরণ এবং সরকারের ওপর আস্থা রাখাও এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি।
লেখক: মহাপরিচালক, বিআইডিএস