খাদ্যাভ্যাস ও জীবন যাপনের পদ্ধতিসহ নানা কারণে মানুষের অপুষ্টি, অতিপুষ্টি, মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ঘাটতির ফলে অসংক্রামক রোগ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে পুষ্টিবিদদের ব্যাপক ভূমিকা থাকলেও তাদের কর্মসংস্থান কাঠামো ও পেশার আইনি স্বীকৃতি নেই। এই পরিস্থিতে সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ গঠনে পুষ্টিবিদদের মানোন্নয়ন, নিবন্ধন ও পেশাগত স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছে ন্যাশনাল নিউট্রেশন অ্যাসোসিয়েশন (এনএনএ)।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বিকেলে জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহ উপলক্ষে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে গোলটেবিল আলোচনায় এ দাবি জানান তারা।
বৈঠকে পুষ্টিবিদদের বর্তমান পেশাগত অবস্থান ও চ্যালেঞ্জ, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে তাদের ভূমিকা ও স্বীকৃতি, পুষ্টিবিদদের জন্য জাতীয় পর্যায়ে নিবন্ধনের প্রয়োজনীতা এবং শিক্ষা প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার মানোন্নয়নের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন বক্তারা।
এনএনএ সভাপতি সুমাইয়া শাহনাজের সভাপতিত্ব ও ডায়েটেশিয়ান কনসালটেন্ট আমাতুল্লাহ শারমীনের সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় পুষ্টি পরিষদের মহাপরিচালক ডা. মাহবুবুর রহমান।
এ ছাড়া অতিথি হিসেবে আরো উপস্থিত ছিলেন শ্যামল কুমার (আইপিএইচ), বিবিএফের চেয়ারম্যান ড. এস.কে রয়, পথিকৃত ইনস্টিটিউট অব হেলথ সাইন্সের ডিরেক্টর অধ্যাপক লিয়াকত আলী, আইএনএফএসের সহকারী অধ্যাপক তানজিনা রহমান, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সের অধ্যাপক ফারজানা সালের।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন যে, জাতীয় পুষ্টি পরিষদ মূলত পলিসি, অ্যাডভোকেসি, প্ল্যানিং, মনিটরিং, রিসার্চ এবং ক্যাপাসিটি বিল্ডিং বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে। তবে তারা সরাসরি ইমপ্লিমেন্টেশন কার্যক্রম পরিচালনা করে না।
বাংলাদেশের ২০১৫ সালে প্রণীত পুষ্টিনীতি ইতোমধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিক অন্তর্ভুক্ত করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমানে এই নীতিমালা আধুনিকায়নের কাজ শুরু হয়েছে এবং এ লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন এনজিও মতামত ও গ্রাম পর্যায়ে গিয়ে মতামত সংগ্রহ করা হয়েছে, যাতে পুষ্টি কার্যক্রম আরও কার্যকর করা যায়।
তিনি বলেন, পুষ্টি সম্পূর্ণভাবে স্বাস্থ্য খাতের একক বিষয় নয়, এখানে প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ পুষ্টি খাতের মাধ্যমে সম্পন্ন হলেও বাকি ২০ শতাংশের জন্য অন্যান্য দপ্তরের সহযোগিতা প্রয়োজন। এ কারণে ২২টি মিশনের মাধ্যমে সমন্বিতভাবে কাজ করা হচ্ছে। পুষ্টির সরবরাহ মূলত কৃষি খাতের ওপর নির্ভরশীল, পাশাপাশি লাইভস্টক, খাদ্য, মা ও শিশু, ক্যাবিনেট ডিভিশন, সমাজকল্যাণ এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, একটি দরিদ্র পরিবারকে অর্থ সহায়তা দিলে তা অন্য কাজে ব্যয় হয়ে যেতে পারে। কিন্তু মায়েদের বা পরিবারের সদস্যদের খাদ্যসংক্রান্ত সঠিক পরামর্শ দেওয়া হলে তা গর্ভস্থ শিশুর সুস্থ বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই ধরনের ছোট ছোট সচেতনতামূলক উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখে।
ডা. রহমান আরও জানান, নিউট্রিশন বিষয়ে সকল স্তরের মানুষের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে এবং প্রতিটি জেলায় অন্তত একজন করে সরকারি নিউট্রিশনিস্ট নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি আশ্বাস দেন যে, পুষ্টিনীতি প্রণয়নে পুষ্টিবিদদের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
জাতীয় পুষ্টি পরিষদ নিবন্ধন প্রক্রিয়া নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে কাজ করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, পুষ্টিনীতিতে পুষ্টিবিদদের অন্তর্ভুক্ত করা গেলে তা বিধিমালায় সংযোজন করা সম্ভব হবে এবং অপুষ্টি প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যাবে।
সভাপতিত্ব বক্তব্যে সুমাইয়া শাহনাজ বলেন, প্রশিক্ষণ, গবেষণা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষাগ্রহণের মাধ্যমে পুষ্টিবিদদেরে দক্ষতা উন্নয়ন একটি সময়ে দাবি। তবে বাস্তবতা হলো আমাদের দেশে পুষ্টিবিদদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান, সুস্পষ্ট নীতিমালা এবং পেশাগত স্বীকৃতি পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে একদিকে যেমন দক্ষ পুষ্টিবিদরা যথাযথ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে জনসাধারণও মানসম্মত পুষ্টিসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
‘সে কারণে আমরা সরকারি এবং বেসরকারি খাতে কাঠামোগত পদ সৃষ্টি, পেশাগত মানোন্নোয়ন ও প্রশিক্ষণ জোরদার করা, একটি জাতীয় পর্যায়ে রেজিস্ট্রেশন এবং স্বীকৃতির ব্যবস্থা চালু করার বিষয়ে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করতে চাই’—যোগ করেন তিনি।
ড. এস.কে রয় বলেন, সরকারিভাবে পুষ্টিবিদদের রেজিস্ট্রেশন হওয়া এখন সময়ের দাবি। পুষ্টিবিদদের আরো বেশি গবেষণা এবং স্বাস্থ্যখাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পরামর্শ দেন।
পথিকৃৎ ইনস্টিটিউট অব হেলথ সাইন্সের ডিরেক্টর অধ্যাপক লিয়াকত আলী বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানে খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগ চালু আছে, সেসব প্রতিষ্ঠানে কারুকলাম একই হওয়ার উচিত। যেন সকল পুষ্টিবিদদের সক্রিয় মানোন্নয়ন ও প্রতিযোগিতা বাড়ে।
বাংলাদেশের পুষ্টিবিদদের পুষ্টি ও হেলথ সেক্টরে ব্যাপক অংশগ্রহণের জন্য আইনগত স্বীকৃতি দরকার বলেও মনে করেন তিনি।
ডায়টিশিয়ান হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কন্টিনেন্টাল হাসপাতালের তাসনিম হাসিন, এনআইসিবিডির সৈয়দা লিয়াকত, পুষ্টিবিদ ফাউন্ডেশন রেবেকা সুলতানা, সাজেদা ফাউন্ডেশন ইসরাত জাহান, এনডিএসএসের সভাপতি শামসুন নাহার মহুয়া, ইজি ডায়েটের আয়েশা সিদ্দীকা ও আখতারুন নাহার আলো প্রমখ।
অংশগ্রহণকারী অতিথিরা নিজস্ব খাতের অভিজ্ঞতা সংক্ষেপে উপস্থাপন করেন এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করণ ও একটি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর প্রস্তাব দেন।
গোলটেবিল আলোচনা সভায় নিম্নোক্ত বিষয়ে সুপারিশ করা হয়, যথা—নিউট্রিশনিস্ট অফিসিয়াল পোস্ট, স্ট্যান্ডার্ডাইজড কারিকুলাম, ট্রেনিং ফ্রেমওয়ার্ক, পেশাগত স্বীকৃতি ও কর্মসংস্থান কাঠামো শক্তিশালীকরণ এবং নিউট্রিশনিস্টস লাইসেন্সকে সরকারি আইন হিসাবে নিয়ে আসা।