পটুয়াখালী জেলা প্রতিনিধি: পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পবিপ্রবি) উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে নতুন করে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির বর্তমান উপ-উপাচার্য (প্রো-ভিসি) অধ্যাপক ড. এস. এম. হেমায়েত জাহানকে সম্ভাব্য উপাচার্য হিসেবে নিয়োগের গুঞ্জন ঘিরে উঠেছে একাধিক অভিযোগ—নিয়োগে অনিয়ম, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, গবেষণায় অসদাচরণ এবং প্রশাসনিক দুর্নীতির অভিযোগে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে।
অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের সময় ড. হেমায়েত জাহান নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করেননি। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী কৃষি বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি আবশ্যক থাকলেও তিনি রাজধানীর একটি কলেজ থেকে প্রাণীবিদ্যায় স্নাতক সম্পন্ন করে পবিপ্রবির কৃষি বনায়ন (এগ্রোফরেস্ট্রি) বিভাগে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পান, যা সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে অভিযোগ ওঠে। জানা যায়, তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত একটি কলেজ থেকে পাস করে এই নিয়োগ পান, যা সে সময় ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০৩ সালের ১ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম আব্দুল হান্নান ভূঁইয়ার মাধ্যমে তাকে এডহক ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, চাকরি স্থায়ীকরণের সময় কৃষি বনায়ন বিভাগের মৌখিক পরীক্ষার বোর্ড তার যোগ্যতা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেনি। পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে তাকে কীটতত্ত্ব বিভাগে স্থায়ী করা হয়, যদিও তিনি ওই বিভাগে আবেদনই করেননি। এরপর ধাপে ধাপে পদোন্নতি পেয়ে তিনি অধ্যাপক হন।
অভিযোগ আছে, আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মাধ্যমে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং একটি প্যানেলের সহসভাপতি নির্বাচিত হন।
ড. হেমায়েত জাহানের বিরুদ্ধে জামায়াতপন্থী রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে। একাধিক সূত্রের দাবি, তিনি জামায়াতপন্থী শিক্ষক হিসেবে পরিচিত এবং জেলা জামায়াতের সুপারিশে প্রো-ভিসি পদে নিয়োগ পান। তিনি পটুয়াখালী ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের পৃষ্ঠপোষক বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন ইউট্যাবের সাধারণ সম্পাদক থাকাকালে শিবিরের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার অভিযোগ ওঠায় তার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে দ্বৈততার প্রশ্ন উঠেছে।
এছাড়া শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পর তিনি সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. আবদুল লতিফ মাসুমের ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন বলে জানা যায়।
সম্প্রতি রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যসহ সংশ্লিষ্টদের অপসারণ দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। অংশগ্রহণকারীরা প্রশাসনিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ তুলে ধরে উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের তদন্ত দাবি করেন।
ড. হেমায়েত জাহানের বিরুদ্ধে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো গবেষণায় সাইটেশন সংখ্যা কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর অভিযোগ। একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালে তার গুগল স্কলার প্রোফাইলে প্রায় ১,৯৬০ সাইটেশন থাকলেও বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩২৬-এ। অভিযোগ রয়েছে, নামের মিল থাকা বিদেশি গবেষকের প্রবন্ধ নিজের প্রোফাইলে যুক্ত করে সংখ্যা বাড়ানো হয়েছিল।
তবে এ বিষয়ে তিনি দাবি করেছেন, এটি গুগল স্কলারের স্বয়ংক্রিয় সংযোজনের ফল। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রমাণিত হলে এটি গুরুতর একাডেমিক অসদাচরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রশাসনিক পদগুলোতে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। শিক্ষকদের একাংশের দাবি, যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, যা শিক্ষক সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করেছে। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডারকে ঘিরে উপাচার্য প্রফেসর ড. কাজী রফিকুল ইসলাম ও উপ-উপাচার্য ড. হেমায়েত জাহানের বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তার ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কাজ পাইয়ে দিতে তদবির করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান, ঠিকাদার মাহফুজ খান ও আমির হোসেনসহ কয়েকজনকে কমিশনের বিনিময়ে কাজ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে নিজেরাও কাজ নিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের ঘনিষ্ঠ এক কর্মকর্তা, যাকে ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে অভিহিত করা হয়, তিনি তার এক ভাইয়ের নামে প্রায় ৭ কোটি টাকার কাজ নিয়েছেন।
পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও এখনো কোনো স্বাধীন তদন্ত শুরু হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ড. হেমায়েত জাহানের নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী প্যানেল গড়ে উঠেছে, যেখানে আরও কয়েকজন বিতর্কিত অধ্যাপক যুক্ত রয়েছেন।
উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের দ্বন্দ্ব প্রশাসনিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। রিজেন্ট বোর্ডের সিদ্ধান্ত, পদোন্নতি ও নিয়োগ নিয়ে বিরোধ প্রকট হয়েছে। এমনকি উপ-উপাচার্যপন্থী শিক্ষকদের পক্ষ থেকে উপাচার্যের বাসভবনে তালা দেওয়ার হুমকির ঘটনাও শোনা গেছে।
এছাড়া পূর্বে বহিষ্কৃত বা বিতর্কিত কয়েকজন শিক্ষক-কর্মকর্তাকে পুনর্বাসনের অভিযোগ উঠেছে, যেখানে উপ-উপাচার্যের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যদিও তিনি দাবি করেছেন, এসব সিদ্ধান্ত পূর্ববর্তী প্রশাসনের।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রশাসনিক দ্বন্দ্বের কারণে তাদের মৌলিক সমস্যাগুলো উপেক্ষিত হচ্ছে। ক্লাসরুম সংকট, আবাসন সমস্যা, হলের নিম্নমানের খাবার ও অবকাঠামোগত সংকট দীর্ঘদিন ধরে সমাধানহীন রয়েছে।
অভিযোগের পরও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত বা স্পষ্ট ব্যাখ্যা না আসায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হলে তার একাডেমিক ও প্রশাসনিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, উপাচার্য পদ নিশ্চিত করতে উচ্চপর্যায়ে তদবির চলছে এবং প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে ড. হেমায়েত জাহান তার পূর্ব নির্ধারিত হজ ফ্লাইট ২৪ এপ্রিল থেকে পরিবর্তন করে ৬ মে করেছেন বলেও জানা গেছে। বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের গুঞ্জনও রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের একটি অংশ এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, বিতর্কিত কাউকে উপাচার্য করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ও একাডেমিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে ড. এস. এম. হেমায়েত জাহান বলেন, “কলেজের ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা ভিসি হতে পারবেন না—এমন কোনো কথা নেই। আমি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃত কলেজ থেকে অনার্স করেছি এবং প্রক্রিয়া অনুযায়ী নিয়োগ পেয়েছি।”
টেন্ডার-বাণিজ্য ও সাইটেশন কেলেঙ্কারি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি ভিসি হওয়ার আলোচনায় আছি, তাই একটি মহল আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।”
এ বিষয়ে ইউজিসির চেয়ারম্যান প্রফেসর মামুন আহমেদ বলেন, বিস্তারিত জানতে পিআরও সেকশনে যোগাযোগ করতে হবে। তবে সংশ্লিষ্ট নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।