গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুর। তামাটে রোদ যেন আকাশ থেকে আগুন ঢালছে। বাইরে বের হলেই লু-হাওয়ার ঝাপটা লাগে। কিন্তু ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) ক্যাম্পাসে পা রাখলেই এই কাঠফাটা রোদ আর তীব্র দাবদাহের ক্লান্তি মুহূর্তেই উবে যায়। ১৭৫ একরের সবুজ প্রাঙ্গণে এখন প্রকৃতি সেজেছে তার নিজস্ব তুলিতে। রক্তিম কৃষ্ণচূড়া, উজ্জ্বল সোনালু, কনকচূড়া আর স্নিগ্ধ জারুলের মিতালিতে ক্যাম্পাস এখন এক জীবন্ত ক্যানভাস।
নাজমুস সাকিব, ইবি প্রতিনিধি:
লাল আবিরে কৃষ্ণচূড়া
ক্যাম্পাসের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই দুচোখ ধাঁধিয়ে দেয় কৃষ্ণচূড়ার লাল আভা। প্রধান ফটক থেকে শুরু করে টিএসসিসি ভবনের সামনে, রবীন্দ্র-নজরুল কলা ভবনের পূর্ব পাশ, প্রশাসনিক ভবনের আশপাশ, চিকিৎসা কেন্দ্রের পাশে, মীর মুগ্ধ সরোবরের ধারে, শাহ আজিজুর রহমান হলের সামনে, শহীদ জিয়াউর রহমান হল মসজিদের সামনে, থানা গেট কিংবা খালেদা জিয়া হলের ভেতর কোথাও এই রঙের ছোঁয়া বাদ যায়নি। শীতকালে জীর্ণ থাকলেও গ্রীষ্মের শুরুতেই গাছটি নিজেকে ঢেলে সাজায়। ভোরের আলোয় যখন লাল পাপড়িগুলো ঝরে পড়ে ঘাসের ওপর, তখন তৈরি হয় এক নরম পুষ্পশয্যা। সেই রক্তিম ছায়ার নিচেই চলে শিক্ষার্থীদের আড্ডা, খুনসুটি আর বন্ধুত্বের নতুন গল্প বোনা।
সাধারণত এপ্রিল থেকে জুনের শেষ পর্যন্ত কৃষ্ণচূড়া ফুলে ভরে ওঠে ক্যাম্পাস। ফুলটির আরেক নাম ‘গুলমোহর’ হলেও ‘কৃষ্ণচূড়া’ নামটিই বেশি প্রচলিত। তবে এ নামের উৎস বা কে এই নাম দিয়েছেন, তা আজও নির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি। উদ্ভিদবিদদের মতে, এর আদি নিবাস মাদাগাস্কার অঞ্চল। শীতকালে পাতা ঝরিয়ে একপ্রকার নিরাবরণ হয়ে থাকলেও গ্রীষ্মের শুরুতেই নতুন রূপে আবির্ভূত হয় এই কৃষ্ণচূড়া। তখন শাখা-প্রশাখা জুড়ে ফুটে ওঠে অসংখ্য আগুনরাঙা ফুল, যা গাছগুলোকে করে তোলে আরও দৃষ্টিনন্দন। আর সেই আগুনরাঙা কৃষ্ণচূড়ার ঝরে পড়া পাপড়িগুলো গাছতলাকেও করে তোলে নান্দনিক।
কনকচূড়ার ‘স্বর্ণঝিলিক’
কৃষ্ণচূড়ার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় কনকচূড়া। কাঁচা হলুদের মতো উজ্জ্বল রঙের এই ফুলগাছটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান মিলনায়তনের পূর্ব পাশে দাঁড়িয়ে আছে আপন ভঙ্গিতে। সেখানে পাশাপাশি ফুটে থাকা কৃষ্ণচূড়া ও কনকচূড়ার লাল-হলুদের অনবদ্য সহাবস্থান যেন প্রকৃতির নিজস্ব তুলিতে আঁকা কোনো জীবন্ত চিত্রকর্ম। ‘কনকচূড়া’ নামটির সৌন্দর্যও কম নয়; এই নামকরণ করেন নিসর্গী দ্বিজেন শর্মা। সবুজ পাতার ঘন আচ্ছাদনের ভেতর থোকা থোকা হলুদ ফুল যেন সূর্যের আলোয় গড়া স্বর্ণঝিলিক, যা চোখে না পড়ে উপায় নেই। ক্যাম্পাসের আরও বেশ কিছু স্থানে ছড়িয়ে থাকা কনকচূড়ার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
হলুদ ঝরনার সোনালু
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মনে ধরার মতো আরেক দৃশ্য হলো সোনালু। প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই সামনে পড়ে সারিবদ্ধ সোনালু। গ্রীষ্মের শুরুতে পাতাবিহীন শাখা থেকে নেমে আসে ঝুলন্ত পুষ্পদণ্ড, আর চারপাশে ফুটে ওঠে পাঁচ পাপড়ির হালকা সৌরভযুক্ত ফুল, যা খুব সহজেই মন কাড়ে। মৃদুমন্দ হাওয়ায় যখন ঝুলন্ত ফুলগুলো দুলে ওঠে, সেই দৃশ্য হৃদয়ের ব্যথাবেদনা উপশম করার মতো প্রশান্তি দিয়ে যায়। জানা যায়, সোনালুর জন্ম হিমালয় এলাকায়। শীতে এ গাছের পাতা ঝরে দীনহীন ভিখারির মতো দেখালেও গ্রীষ্মের শুরুতেই শাখা ভরে ওঠে কাঁচা হলুদ ফুলে। ফিকে সবুজ আর কাঁচা হলুদে রচিত হয় চমৎকার বর্ণসুষমা। একবার চোখে পড়লে, তা কোনোদিন ভুলবার নয়। ঘুরতে আসাদের কাছে সোনালুর সৌন্দর্যই যেন এক নগদ প্রাপ্তি। আর সেই প্রাপ্তি মিলবে এই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে।
বেগুনি লাবণ্যে জারুল
তপ্ত রোদে যখন চোখ একটু আরাম খোঁজে, তখন প্রশান্তি দেয় জারুলের স্নিগ্ধ বেগুনি রঙ। ফুটবল মাঠের উত্তর-পূর্ব কোণ, শাহ আজিজুর রহমান হলের দক্ষিণ-পশ্চিম ও টিএসসিসির দক্ষিণ-পূর্ব পাশের লিচু বাগানসহ বিভিন্ন স্থানে থোকায় থোকায় ফুটে আছে জারুল। জানা যায়, জারুল ফুলের আদি নিবাস শ্রীলঙ্কা। পরবর্তীতে এটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এটি একটি পাতাঝরা বৃক্ষ; শীতকালে পাতা ঝরে গেলেও গ্রীষ্মে গাছটি ভরে ওঠে বেগুনি ফুলে। এর কোনো নিজস্ব ঘ্রাণ নেই বললেই চলে। তবে গন্ধহীন হলেও ফুলটির বেগুনি ব্যঞ্জনার যে অপার সৌন্দর্য, তা দিয়েই সে ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থী ও আগত দর্শনার্থীদের হৃদয়ে জাগিয়ে তোলে এক অনন্য ভালো লাগার আবেশ।
বসন্তকে ফুলের ঋতু বলা হলেও ইবি ক্যাম্পাসের এই দৃশ্যপট বলছে অন্য কথা। রোদের তীব্রতা যতই বাড়ুক, প্রকৃতি যেন তার শ্রেষ্ঠ রঙগুলো উজাড় করে দিয়েছে এই বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠেই। সবুজ পাতার আড়াল ভেদ করে আগুনরাঙা কৃষ্ণচূড়ার বিস্তার কিংবা সরু শাখা বেয়ে ঝরে পড়া সোনালুর লম্বা হলুদ পুষ্পমালা সবই প্রমাণ করে, প্রকৃতি তার জীর্ণতা কাটিয়ে ঠিক এভাবেই ফিরে আসে নতুনের জয়গানে।