ঢাকা

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মিশে গেলেন সাবেক বাংলাদেশি ছিটমহলবাসীরা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ছবি: সংগৃহীত ছবি: সংগৃহীত
যেভাবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মিশে গেলেন সাবেক বাংলাদেশি ছিটমহলবাসীরা

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গ্রহণ পর্ব সম্পন্ন হয়েছে। ব্যালট বাক্সে বন্দি হয়েছে প্রার্থীদের ভাগ্য, আর রাজ্যজুড়ে এখন চলছে ফলাফলের চুলচেরা বিশ্লেষণ। তবে এই রাজনৈতিক ডামাডোলের মাঝেই কোচবিহার জেলার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের সাবেক ছিটমহলগুলোতে কান পাতলে শোনা যায় এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিবৃত্ত। দুই দশক আগের সেই পরিচয়হীন জনপদ আজ উন্নয়নের ছোঁয়ায় বদলে গেলেও, রাজনীতির চোরাবালিতে একসময়ের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সুর আজ কিছুটা হলেও বিভক্ত।


আজ থেকে ঠিক ২০ বছর আগে, ২০০৬ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে কোচবিহারের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে ছিল এক অদ্ভুত বাস্তবতা। ভারতের ভূখণ্ডের ভেতরেই ছিল বাংলাদেশি ভূখণ্ড ‘ছিটমহল’। পোয়াতুরকুঠি বা মশালডাঙ্গার মতো গ্রামগুলোতে যাওয়ার জন্য কোনো কাঁটাতারের বেড়া ছিল না, ছিল না সীমান্তরক্ষীদের কড়া পাহারা। চাষের খেতের মাঝখানের একটি সরু আলপথই ছিল দুই দেশের সীমানা। ২০ বছর আগে যে পথ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় মানুষ শুনত ‘এই ভারতে ছিলেন, এখন বাংলাদেশে ঢুকলেন’, আজ ২০২৬ সালে সেই পথে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। সেই আলপথ আজ ঢালাই করা পাকা রাস্তা, যেখানে মানুষের জীবন আর ‘অতীত’ ও ‘বর্তমান’-এর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে নেই।


ছিটমহলবাসীদের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি আসে ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই ও ১ আগস্টের মধ্যরাতে। ভারত ও বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্থল-সীমা চুক্তি অনুযায়ী, ভারতের অভ্যন্তরে থাকা ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহল এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ১১১টি ভারতীয় ছিটমহল বিনিময় হয়। যুগের পর যুগ ধরে যারা রাষ্ট্রহীন, পরিচয়হীন এবং নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত ছিলেন, তারা রাতারাতি ফিরে পান তাদের আত্মপরিচয়। ২০২৬-এর এই নির্বাচনে সাবেক ছিটমহলের বাসিন্দারা কেবল ভোটার নন, তারা এখন নিজেদের এলাকার উন্নয়নের দাবিদার।


আজকের প্রজন্ম যখন পাকা রাস্তা আর বিদ্যুতের আলোয় বড় হচ্ছে, তখন প্রবীণদের স্মৃতিতে এখনও দগদগে সেই বঞ্চনার দিনগুলো। কয়েক দশক ধরে তারা ছিলেন নিজ ভূমিতে পরবাসী। বাড়ির ওপর দিয়ে ভারতের বিদ্যুতের লাইন গেলেও তাদের ঘরে ছিল অন্ধকার। শিক্ষা বা চিকিৎসার জন্য তাদের নাম ও পরিচয় ভাঁড়িয়ে ভারতীয় আত্মীয়দের পরিচয় ব্যবহার করতে হতো। এমনকি অনেক সময় ভারতীয় হাসপাতাল থেকে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হতো কেবল ‘ছিটের বাসিন্দা’ হওয়ার অপরাধে। ২০০৬ সালে তৎকালীন নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের কাছে যখন এই প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, তখন তাদের কাছেও এই প্রান্তিক মানুষদের ভোটাধিকার নিয়ে কোনো সদুত্তর ছিল না।


সাবেক ছিটমহলবাসীদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে একটি নাম কিংবদন্তি হয়ে আছে জিহাদ হোসেইন ওবামা। ২০১০ সালে যখন তার জন্ম হওয়ার কথা, তখন তার মা আসমা বিবি এবং বাবা শাহজাহান শেখ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তারা কোনো মিথ্যা পরিচয় দেবেন না। ভারতীয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রথমে তাদের ফিরিয়ে দিলেও, ছিটমহলবাসীদের সম্মিলিত আন্দোলনের মুখে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। নিজের আসল পরিচয় আর ছিটমহলের ঠিকানায় ভারতে জন্মানো প্রথম শিশু ছিল এই জিহাদ। আজ সেই জিহাদ ১৬ বছরের কিশোর। তার নামেই যেন মিশে আছে পরিচয় ফিরে পাওয়ার এক অসম যুদ্ধের বিজয়গাথা।

২০২৬ সালের নির্বাচনে সাবেক ছিটমহলগুলোতে গেলে দেখা যায় অভূতপূর্ব পরিবর্তন। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছেছে, গড়ে উঠেছে স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং কমিউনিটি হল। তবে নাগরিকত্বের অধিকার পেলেও কিছু আক্ষেপ এখনও রয়ে গেছে। পোয়াতুরকুঠি বা মশালডাঙ্গার বাসিন্দাদের অভিযোগ, তারা জমির খতিয়ান পেলেও দলিল এখনও হাতে পাননি। অনেক জায়গায় পরিকল্পিত স্কুল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভবন তৈরি হলেও পরিষেবা পুরোপুরি চালু হয়নি। আবার নাগরিক তালিকায় নাম বাদ পড়ার মতো সমস্যাও দেখা দিয়েছে, যেমনটা ঘটেছে ওসমানের পরিবারের ক্ষেত্রে, যার ফলে এবারের নির্বাচনে তিনি ভোট দিতে পারেননি।


ছিটমহল বিনিময়ের দাবিতে একসময় যারা দল-মত নির্বিশেষে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছিলেন, আজ ২০২৬-এ এসে তাদের মধ্যে এক অদৃশ্য দেওয়াল তৈরি হয়েছে। ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির সেই ঐক্য আজ অনেকটাই ম্লান। কেউ এখন তৃণমূল কংগ্রেসের একনিষ্ঠ সমর্থক, কেউ বিজেপির অনুসারী, আবার কেউ বামপন্থার দিকে ঝুঁকেছেন। সাবেক আন্দোলনের প্রধান নেতা দীপ্তিমান সেনগুপ্ত একসময় বিজেপিতে যোগ দেওয়ায় আন্দোলনের ভেতরে রাজনৈতিক ফাটল ধরেছিল। বাসিন্দাদের আক্ষেপ, আজ তারা রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হয়ে যাওয়ায় সম্মিলিতভাবে নিজেদের বাকি দাবিগুলো আদায় করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন সাবেক ছিটমহলবাসীদের জন্য কেবল একটি গণতান্ত্রিক উৎসব নয়, এটি তাদের অস্তিত্ব রক্ষার এক চূড়ান্ত পরীক্ষা। পরিচয়হীনতার অন্ধকার ঘুচলেও এখন তাদের লড়াই অর্থনৈতিক অধিকার এবং রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিষ্ঠার। দীর্ঘ আন্দোলনের ফসল হিসেবে পাওয়া এই নাগরিকত্ব আর উন্নয়ন যেন রাজনীতির জটিলতায় হারিয়ে না যায়, সেটাই এখন পোয়াতুরকুঠি থেকে মশালডাঙ্গার প্রতিটি মানুষের প্রার্থনা।



কমেন্ট বক্স