রংপুরের গংগাচড়া উপজেলার বড়বিল ইউনিয়নের মনিরাম দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের একমাত্র খেলার মাঠে গাছ লাগিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে খেলাধুলা বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও এলাকার যুবসমাজের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, মাঠে খেলাধুলা বন্ধ থাকায় তরুণদের মধ্যে মাদকসেবন, অনলাইন জুয়ার আসক্তি ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় বাড়ছে।
স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও সচেতন ব্যক্তিরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিক্ষিত ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১৯৯৩ সালে মনিরাম দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তবে সম্প্রতি বিদ্যালয়ের মাঠে গাছ লাগিয়ে খেলাধুলা বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা ফেসবুকে অভিযোগ করে জানান, মনিরাম স্কুল মাঠটি পার্শ্ববর্তী সাত থেকে আটটি গ্রামের মধ্যে একমাত্র খেলার মাঠ। পূর্বে নিয়মিত খেলাধুলা হলেও বর্তমানে মাঠে গাছ লাগিয়ে সেই সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থী, যুবসমাজ ও সচেতন মহল প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে একাধিকবার কথা বললেও কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বরং মামলার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি আলোচনায় এলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার জেসমিন আক্তার বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেন। সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখে শিক্ষার্থীদের দাবি যৌক্তিক বলে স্বীকার করেন এবং মাঠে লাগানো চারা গাছ অপসারণ করে খেলাধুলার উপযোগী করার নির্দেশ দেন।
কিন্তু নির্দেশনার পরও মাঠটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাঠে লাগানো গাছগুলো এখনও সরানো হয়নি।
এ সময় শিক্ষার্থীরা আরও বেশ কয়েকটি অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরে। তাদের ভাষ্য, শিক্ষকের ছুটির কারণে টানা চার মাস ইংরেজি ক্লাস বন্ধ রয়েছে। ভোকেশনাল শাখায় পর্যাপ্ত উপকরণ না থাকায় ব্যবহারিক ক্লাস হয় না। টয়লেট ব্যবস্থাপনা নাজুক, শিক্ষার্থীদের নিজেদের টাকায় মার্কার কলম কিনতে হয়। ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো টিনশেড ভবন অপসারণ করা হয়নি। জাতীয় দিবস যথাযথভাবে পালন করা হয় না এবং দৈনিক সমাবেশও অনুষ্ঠিত হয় না।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, স্কুলগেট তালাবদ্ধ থাকলেও মাঠে সবজি চাষ, তামাক শুকানো এবং গরু-ছাগল চরানোর ব্যাপারে কোনো বাধা নেই। অথচ খেলাধুলার ক্ষেত্রেই আরোপ করা হয়েছে নিষেধাজ্ঞা।
সাবেক শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান শয়ন বলেন, ‘একসময় এই মাঠে প্রতিদিন খেলাধুলা হতো। এখন সেই সুযোগ না থাকায় শিক্ষার্থী ও যুবসমাজ বিপথে যাচ্ছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার।’
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল বাশার বলেন, ‘বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। ইউএনও স্যার মাঠে এসে চারা গাছ সরানোর নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি যা বলবেন, সেটিই করা হবে।’
রংপুর বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সদস্য ও যমুনা টেলিভিশনের সিনিয়র রিপোর্টার মাজহার মান্নান বলেন, ‘লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খেলার মাঠে গাছ লাগিয়ে খেলাধুলা বন্ধ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
গংগাচড়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু সাঈদ মো. আরিফ মাহফুজ বলেন, ‘বিষয়টি আমাকে জানানো হয়েছে। সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
উপজেলা নির্বাহী অফিসার জেসমিন আক্তার বলেন, ‘বিদ্যালয় পরিদর্শন করে দেখেছি শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা বিঘ্নিত হচ্ছে। মাঠটি খেলাধুলার উপযোগী করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
এলাকার সচেতন মহলের দাবি, বিদ্যালয় যেমন শিক্ষার কেন্দ্র, তেমনি এর খেলার মাঠও সুস্থ ও মানবিক প্রজন্ম গঠনের অন্যতম ভিত্তি। তাই দ্রুত মাঠটি শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে খেলাধুলার পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।