এটা তো আমেরিকার ভিসা না, এটা আমার প্রিয় জন্মভূমির ভিসা—তবু কেন এত ব্যুরোক্রেসি, অবহেলা আর নীরবতা?—অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী মাহফুজ রহমানের এই ক্ষোভভরা কথাগুলো যেন এখন হাজারো প্রবাসী বাংলাদেশির অভিজ্ঞতার প্রতিচ্ছবি।
অন্যদিকে তিন মাস আগে পাসপোর্ট নবায়নের জন্য আবেদন করেও কোনো আপডেট না পেয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন প্রবাসী রাফিয়া ইসলাম। ফোন, ই-মেইল—সব মাধ্যমেই যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া না পাওয়ার অভিযোগ তার।
এই দুই ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়।
সিডনি থেকে ক্যানবেরা—অস্ট্রেলিয়াজুড়ে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছ থেকে একই ধরনের অভিযোগ উঠে আসছে। বাংলাদেশ হাইকমিশন ও সিডনি কনস্যুলেট জেনারেল অফিসের বিরুদ্ধে ফোন না ধরা, ই-মেইলের জবাব না দেওয়া এবং দায়সারা ও অপেশাদার আচরণের অভিযোগ দিন দিন বাড়ছে।
সব মিলিয়ে, অস্ট্রেলিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশন ও সিডনি কনস্যুলেটের সেবা নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রবাসীরা। ভুক্তভোগীদের মতে, তথ্যসেবায় বিলম্বের কারণে ভোগান্তি ক্রমেই বাড়ছে।
অন্যদিকে, সিডনি কনস্যুলেটের ওয়েবসাইটেও নিয়মিত হালনাগাদ না থাকায় দুই-এক বছর আগের পুরোনো তথ্যই ভরসা হয়ে আছে। ফলে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে এবং বিভ্রান্তি বাড়ছে।
প্রবাসীদের অভিযোগ, পাসপোর্ট নবায়ন, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি, জন্মনিবন্ধন সনদ ও নো ভিসা রিকোয়ারমেন্ট (এনভিআর) প্রক্রিয়াসহ বিভিন্ন জরুরি কাজে তারা হাইকমিশন ও কনস্যুলেটের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সিডনি কনস্যুলেটের টেলিফোন সংযোগ কার্যত অকার্যকর।
হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থাকলেও কল রিসিভ করা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। ই-মেইলেও দিনের পর দিন কোনো উত্তর মেলে না। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে সরাসরি অফিসে গেলেও সেখানে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেবা পান না বলে অভিযোগ। দূরবর্তী শহর থেকে আসা প্রবাসীদের জন্য এতে সময় ও ব্যয়ের চাপও বাড়ছে।
প্রবাসী সরওয়ার মাহমুদ বলেন, জরুরি সেবায় বিলম্ব ও অপেশাদার আচরণ মানসিক চাপ তৈরি করছে।
শুধু এসব অভিযোগই নয়, অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও একই চিত্র প্রতিফলিত হচ্ছে। গুগল রিভিউতে একাধিক প্রবাসী কম রেটিং দিয়ে সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। বিদেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী এসব প্রতিষ্ঠানে আরও পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রবাসী হুসনাইন চৌধুরী অভিযোগ করে গুগল রিভিউতে লিখেছেন, অস্ট্রেলিয়ায় আমার ২৬ বছরের জীবনে সিডনিতে অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট অফিস থেকে এমন বাজে পরিষেবা আমি আগে কখনো পাইনি। সম্প্রতি আমার স্ত্রীর এনভিআর স্ট্যাম্পের জন্য গিয়েছিলাম; তার মা বাংলাদেশের একটি হাসপাতালে গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন। আমার পরিবার কনস্যুলেট জেনারেলের সঙ্গে কথা বলার জন্য সকাল ১১টা থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিল, কিন্তু তাদের দেখা মেলেনি।
প্রবাসী আবিদ হোসেন বলেন, ফোনে যোগাযোগ করা যায় না, ইমেইলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায় না। অফিসে গেলে নানা অজুহাতে অসদাচরণ করেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম সমিতি অস্ট্রেলিয়ার সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইফতেখার উদ্দিন বলেন, কমিউনিটি সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো এবং প্রবাসীদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ ও সেবার মান উন্নয়ন এখন জরুরি। এতে প্রবাসীদের আস্থা ফিরবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
সার্বিক বিষয়ে জানতে অস্ট্রেলিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার এফ এম বোরহান উদ্দিন এবং সিডনি কনস্যুলেট জেনারেল শেলি সালেহীনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে উভয়েই ফোন রিসিভ করেননি।
প্রবাসী সচেতন মহল বলছে, অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ন্যূনতম সেবা নিশ্চিত করতে কেন এমন দুর্ভোগ—এ প্রশ্ন এখন জোরালো হচ্ছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই অসন্তোষ আরও বাড়বে বলে তাদের মন্তব্য।
উল্লেখ্য, এফ এম বোরহান উদ্দিন ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং শেলি সালেহীন একই বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর সিডনি কনস্যুলেট জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব নেন।