ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে বড় জয়ের পর রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদল হতেই রাজ্যজুড়ে ব্যাপক সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। বসিরহাটে সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে ওসিসহ দুই পুলিশ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এ ছাড়া রাজ্যের বিভিন্নস্থানে তৃণমূল কংগ্রেসের কার্যালয় ভাঙচুর, দখল ও বিভিন্ন স্থানের নাম পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এক ভয়ার্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন গণমাধ্যমের বরাতে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ ন্যাজাটের ওসি
ভোট পরবর্তী হিংসার সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে উত্তর ২৪ পরগনার ন্যাজাটে। মঙ্গলবার রাজবাড়ি এলাকায় দুই রাজনৈতিক দলের সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন ন্যাজাট থানার ওসি ভরত প্রসূন কর। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, একটি বাড়ির ভেতর থেকে ছোড়া গুলি ওসির পায়ে লাগে। ঘটনায় আরও এক কনস্টেবল গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। বর্তমানে তারা কলকাতার চিত্তরঞ্জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এই ঘটনা প্রশাসনের নিরাপত্তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
ন্যাজাট থানার রাজবাড়ি এলাকায় তৃণমূল ও বিজেপি সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বেধেছিল মঙ্গলবার রাতে। সেই সময় সংঘর্ষ থামাতে সেখানে যান ন্যাজাট থানার ওসির ভরত প্রসূন করসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ। সেখানে ভরত প্রসূন কর এবং অন্য দুই পুলিশ কনস্টেবল গুলিবিদ্ধ হন বলে জানা গেছে। আহতদের মধ্যে একজন নারী কনস্টেবল ছিলেন বলে জানা গেছে, অপরজন রাজবাড়ি ফাঁড়ির পুলিশ ভাস্বত গোস্বামী। এসব কেন্দ্রীয় বাহিনীর দুজন জওয়ানও গুলিবিদ্ধ হন।
নিউমার্কেটে বুলডোজার ও লেনিনের মূর্তি ভাঙচুর
কলকাতার নিউমার্কেট এলাকায় দেখা গেল অভাবনীয় দৃশ্য। ডিজে-র শব্দ আর জয় শ্রীরাম স্লোগানের মধ্যে পুলিশের সামনেই বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠনের অফিস। এমনকি পাশের একটি মাংসের দোকানও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জে শ্রীপত সিংহ কলেজের সামনে থাকা লেনিনের আবক্ষ মূর্তিটি হাতুড়ি ও শাবল দিয়ে ভেঙে ফেলা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, মূর্তি ভাঙার সময় স্লোগান দেওয়া হয় যে, সেখানে এখন থেকে শিবাজি ও গোপাল পাঁঠার মূর্তি বসানো হবে।
সিরাজ পার্ক এখন শিবাজি উদ্যান
বিজেপি ক্ষমতায় আসার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বারাসতের বিখ্যাত সিরাজ উদ্যানের নাম পাল্টে দিলেন দলের কর্মীরা। মঙ্গলবার বিজেপিকর্মীরা সিরাজ উদ্যানের নেমপ্লেট সরিয়ে ওই পার্কের নামকরণ করেছেন ‘শিবাজি উদ্যান’। শুধু পার্ক নয়, ‘মসজিদবাড়ি রোড’ তোরণটির নাম বদলে রাখা হয়েছে ‘নেতাজিপল্লি রোড’।
কথিত আছে, বাংলার শেষ নবাব সিরাজদৌল্লা মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতায় যাওযার পথে বারাসতের ওই জায়গার জলাশয়ে নেমে নবাবের ঘোড়া পানি খেয়েছিল। ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত থাকায় ওই পার্কের নামকরণ করা হয় সিরাজ উদ্যান।
পার্কের নাম বদল প্রসঙ্গে বারাসত পুরসভার চেয়ারম্যান সুনীল মুখোপাধ্যায় বলেন, কয়েকজন বিজেপি কর্মী গিয়ে উদ্যানের নামকরণ করেছে শিবাজি উদ্যান। রাজনৈতিক পরিস্থিতি একটু শান্ত হলে বিষয়টি বোর্ড মিটিংয়ে তুলব। বোর্ড যা সিদ্ধান্ত নেবে, সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ করা হবে।
বিজেপি নেতা তাপস মিত্র বলেন, ‘দলের পক্ষ থেকে কেউ এমন নির্দেশ দেননি। ব্যক্তিগত ভাবে কেউ কেউ এটা করেছে। এর দায় দলের নয়।’
এ দিন বাগদার হেলেঞ্চার বি আর আম্বেদকর শতবার্ষিকী কলেজে অখিল ভারত বিদ্যার্থী পরিষদের কর্মীরা গঙ্গাজল ছিটিয়ে ছাত্র সংসদের অফিসে গেরুয়া পতাকা লাগিয়ে দেয়। বাগদার রণঘাট গ্রাম পঞ্চায়েত ও ডহরপোতা সমবায় সমিতিতেও তালা লাগিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিজেপির বিরুদ্ধে। পঞ্চায়েতের সামনে কালি দিয়ে বিজেপি লিখে পদ্মফুল আঁকা হয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় বাগদা থানার পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী। পুলিশের মধ্যস্থতায় প্রায় আধ ঘণ্টা পরে তালা খুলে দেওয়া হয়।
এই প্রসঙ্গে বিজেপির স্থানীয় মণ্ডল সভাপতি দিবাকর তরফদার বলেন, আমরা এই সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী নই। গণতান্ত্রিক দেশে এটা করা যায় না। যারা করেছে, তারা ভুল করেছে। দলের পক্ষ থেকে এমন কোন নির্দেশও দেওয়া হয়নি।
জেলায় জেলায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও প্রাণহানি
সহিংসতা কেবল ভাঙচুরে সীমাবদ্ধ থাকেনি, ঝরেছে রক্তও। বীরভূমের নানুরে আবির শেখ নামে এক তৃণমূল কর্মীকে কুপিয়ে খুনের অভিযোগ উঠেছে। খাস কলকাতায় বেলেঘাটায় তৃণমূল কর্মী বিশ্বজিৎ পট্টনায়কের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুর ও তপনে তৃণমূল অফিসে আগুন দেওয়া হয়েছে। এমনকি তপনে ব্যাগভর্তি বোমা উদ্ধার করেছে পুলিশ।
আবার উল্টো চিত্র দেখা গেছে হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরে। সেখানে যাদব বর নামে এক বিজেপি কর্মীকে পিটিয়ে খুনের অভিযোগ উঠেছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে।
আঁচ পড়ল টলিউডেও
রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলের পর তার রেশ এবার স্পষ্টভাবে পৌঁছে গেল টলিউডের অন্দরে। তৃণমূলের ভরাডুবি, বিনোদন জগতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন ইস্টার্ন ইন্ডিয়া মোশন পিকচার্স অ্যাসোসিয়েশনকে (ইম্পা) ফেলে দিয়েছে তীব্র টানাপোড়েন। মঙ্গলবার বিকেলে ইম্পা অফিসে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বলেই মনে করছেন অনেকে।
সেখানে গেরুয়া আবির ছড়িয়ে ‘পরিবর্তন’-এর প্রতীকী উদযাপন যেমন দেখা যায়, তেমনই গঙ্গাজল ছিটিয়ে ‘শুদ্ধিকরণ’-এর মতো ঘটনাও নজরে আসে। এই প্রতীকী পদক্ষেপের মাধ্যমে তারা স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছেন- সংগঠনের ভেতর থেকে রাজনৈতিক প্রভাব সরানো দরকার।
জয়ী প্রার্থীর বাড়িতে হামলা
স্বরূপনগরে জয়ী তৃণমূল প্রার্থী বীণা মণ্ডলের বাড়িতে ঢুকে গাড়ি ভাঙচুর ও অশ্রাব্য গালিগালাজ করার অভিযোগ উঠেছে বিজেপি সমর্থকদের বিরুদ্ধে। বীণা মণ্ডল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় এলেও আমি মানুষের ভোটে জিতেছি। বিধায়কের বাড়িতে যদি এই হামলা হয়, তবে সাধারণ কর্মীদের কী হবে?
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও প্রশাসনের কড়া বার্তা
তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন যে, রাজ্যজুড়ে তিন শতাধিক পার্টি অফিস ভাঙা হয়েছে। অন্যদিকে, বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য দলীয় কর্মীদের শান্ত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন এবং প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছেন।
এদিকে ভোট-পরবর্তী সহিংসতা রুখতে ভারতের নির্বাচন কমিশন জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে। রাজ্যের মুখ্যসচিব এবং পুলিশের ডিজিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন কোনো ধরনের অশান্তিকে প্রশ্রয় না দেওয়া হয়। বর্তমানে এসব এলাকায় কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।