প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকেও আধুনিক ও সময়োপযোগী করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বর্তমান বিশ্বে জ্ঞানের চর্চা আর একক কোনো বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং বিভিন্ন বিষয়ের সমন্বয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন জ্ঞানের ক্ষেত্র।
মঙ্গলবার (১২ মে) সকালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন আয়োজিত ‘বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার রূপান্তর’ শীর্ষক এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়–এর সিনেট ভবনে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সীমিত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও সঠিক পরিকল্পনা ও মেধার যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে বড় পরিবর্তন সম্ভব। তিনি মেধাপাচার রোধ করে দেশের ভেতরেই মেধার বিকাশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তার মতে, জ্ঞানভিত্তিক ও মেধানির্ভর সমাজ গঠনে শিক্ষা, গবেষণা, সৃজনশীলতা এবং যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত পুরো শিক্ষা কারিকুলাম যুগোপযোগী করে পুনর্গঠন করা জরুরি। নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন ও কর্মমুখী শিক্ষা ছাড়া বেকারত্ব দূর করা সম্ভব নয়, একই সঙ্গে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা ছাড়া বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকাও কঠিন হয়ে পড়বে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিং প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান এখনও সন্তোষজনক নয়। এ বিষয়ে শিক্ষাবিদদের আরও গভীরভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। শুধু পাঠ্যভিত্তিক শিক্ষা নয়, গবেষণা ও উদ্ভাবনেও সমান গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।
তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরা শিক্ষা ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এলামনাইদেরও শিক্ষা ও গবেষণার উন্নয়নে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি দক্ষতার ঘাটতিকে দায়ী করেন। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার উচ্চশিক্ষায় এপ্রেন্টিসশিপ, ইন্টার্নশিপ এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী জানান, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক ধারণাকে বাণিজ্যিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য সিড ফান্ডিং ও ইনোভেশন গ্রান্ট দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো ক্যাম্পাসভিত্তিক উদ্যোক্তা তৈরি করা, যাতে শিক্ষার্থীরা চাকরির অপেক্ষায় না থেকে নিজেরাই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে।
এ ছাড়া উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন ইনস্টিটিউট’ এবং ‘সায়েন্স পার্ক’ গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি বিজ্ঞান মেলা, ইনোভেশন ফেয়ার ও প্রযুক্তিভিত্তিক বিভিন্ন আয়োজনকে উৎসাহিত করার কথাও বলেন।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবটিক্স, অটোমেশন, ইন্টারনেট অব থিংস, বায়োটেকনোলজি, সাইবার সিকিউরিটি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও বিগ ডাটার যুগে প্রবেশ করেছে। এসব প্রযুক্তি যেমন প্রচলিত চাকরির ধরন বদলে দিচ্ছে, তেমনি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সময়ে ডাটা সায়েন্সের সঙ্গে বায়োলজি কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সঙ্গে সমাজবিজ্ঞানের সমন্বয় ঘটছে, যা জ্ঞানের পরিধিকে আরও বহুমাত্রিক করে তুলছে।
বক্তব্যে তিনি প্রযুক্তিনির্ভর বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ টেনে বলেন, আধুনিক বিশ্বে অনেক প্রতিষ্ঠান সরাসরি পণ্য বা সম্পদের মালিক না হয়েও প্রযুক্তিনির্ভর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সফলতা অর্জন করছে।
শেষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী নিজের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পাবে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের পাশাপাশি ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধও সমানভাবে ধরে রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।