আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সীমান্তপথে দেশে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ঢোকার প্রবণতা বেড়েছে। পাচারকারীরা পিস্তল, রিভলভার, রাইফেলসহ আধুনিক অস্ত্র আনছে—যা ইতিমধ্যেই সহিংসতায় ব্যবহৃত হচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে গুলিবিদ্ধ হয়ে হতাহত হয়েছেন অন্তত ১৭০ জন, যাদের মধ্যে অর্ধশতাধিক নিহত।
চট্টগ্রামের ব্যস্ততম সড়কে গত মঙ্গলবার প্রকাশ্যে আব্দুল হাকিম নামে এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, এসব ঘটনার পেছনে সীমান্তপথে ঢোকা অবৈধ অস্ত্র বড় ভূমিকা রাখছে।
মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম জানান, বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে—চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন ১৭০ জনের বেশি মানুষ, যাদের মধ্যে অর্ধশতাধিক নিহত।
পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১৭টি সীমান্তপথে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র দেশে প্রবেশ করছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য রুট হলো—বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া, কুমিল্লা, রাজশাহীর গোদাগাড়ি, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ ও রহনপুর, ঝিনাইদহের মহেশপুর, সাতক্ষীরার কলারোয়া, চুয়াডাঙ্গার দর্শনা ও মেহেরপুর-কুষ্টিয়া সীমান্ত।
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে গত বছরের সেপ্টেম্বরে যৌথ বাহিনী অভিযান শুরু করলেও কিছুদিন পর তা শিথিল হয়ে পড়ে। এখন আবার নতুন করে অভিযান জোরদার করা হচ্ছে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, গত বছরের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। এবছরের প্রথম ৯ মাসের পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক।
র্যাব ও পুলিশের অভিযান
র্যাবের মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান জানান, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন অপরাধে জড়িত প্রায় ১৩ হাজার ১০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত বছর র্যাব উদ্ধার করেছে ৪৮৪টি আগ্নেয়াস্ত্র, যার মধ্যে পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্রও রয়েছে।
সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া বুয়েট শিক্ষার্থী সাবেকুন নাহার সনি হত্যা মামলার আসামি মুশফিক উদ্দীন টগর স্বীকার করেছেন, তিনি সীমান্ত থেকে অবৈধ অস্ত্র এনে রাজধানীতে বিক্রি করতেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরো অভিযান চলছে বলে জানিয়েছেন র্যাব-৩ এর পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৬৪টি থানার মধ্যে ৪৬০টি থানা ও ১১৪টি ফাঁড়িতে লুটপাটের সময় প্রায় ১,৩৫০টি অস্ত্র লুট হয়, যার অনেকগুলো এখনো উদ্ধার হয়নি। আইজিপি বাহারুল আলম জানিয়েছেন, এসব অস্ত্রের কিছু পার্বত্যাঞ্চল ও আরসার হাতে পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সীমান্তে বিজিবির উদ্ধার অভিযান
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) চলতি বছরের প্রথম ৮ মাসে বিভিন্ন সীমান্ত থেকে ৬০টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও চার হাজার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করেছে। এছাড়া হাতবোমা, গ্রেনেডসহ বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরকও জব্দ করা হয়েছে।
বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে কিছু অসাধু চক্র সীমান্ত দিয়ে দেশে অস্ত্র আনার চেষ্টা করছে। দেশের নিরাপত্তা বজায় রাখতে সবাইকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে হবে।”
নির্বাচনের আগে সক্রিয় হচ্ছে সন্ত্রাসীরা
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, জামিনে মুক্ত কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন সুইডেন আসলাম, কিলার আব্বাস, পিচ্চি হেলাল, ইমন ও ফ্রিডম রাসুসহ ঢাকার অপরাধজগতের পরিচিত মুখরা। বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসীদের সহযোগিতায় নতুন বাহিনীও গড়ে উঠছে, যেখানে কিশোর ও তরুণ সদস্যদের হাতে অবৈধ রিভলভার-পিস্তল তুলে দেওয়া হচ্ছে।
গত ১ আগস্ট রাজধানীর মহাখালীতে জামাল হোসেনকে গুলি করে হত্যা করা হয়, এবং এর একদিন পর দারুসসালামে ব্যবসায়ী তাহমিনা রহমানকে নিজ প্রতিষ্ঠানে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এসব ঘটনায় একই গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে পুলিশ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের কার্যক্রম বড় উদ্বেগের কারণ, এবং এ বিষয়ে দেশজুড়ে অভিযান আরও জোরদার করা হচ্ছে।