দেশের ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট আরও গভীর হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাতে গোনা কয়েকটি ব্যাংক ছাড়া অধিকাংশ ব্যাংকে আমানত রাখা এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মুনাফা তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের আসল টাকা ফেরত পাওয়া নিয়েও তৈরি হয়েছে শঙ্কা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। তবে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বহু ব্যাংক বছরের পর বছর প্রকৃত আর্থিক তথ্য গোপন করেছে। ইতোমধ্যে ১২টি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ৭০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। অনেক ব্যাংকে গ্রাহকরা টাকা তুলতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। দেশের ৬২টি ব্যাংকের মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। পাশাপাশি ২৩টি ব্যাংকে মূলধন ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এমকে মুজেরী বলেন, ব্যাংক, এনবিএফআই, বিমা ও শেয়ারবাজারসহ পুরো আর্থিক খাতেই এখন আস্থার সংকট চলছে। তার ভাষায়, বিভিন্ন ব্যাংকে লুটপাট ও জালিয়াতির কারণে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণ ৮০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ টাকা রাখতে ভয় পাচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, কিছু গোষ্ঠী ব্যাংক থেকে অর্থ আত্মসাৎ করেছে এবং তাদের সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থারও যোগসাজশ ছিল। এই পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো সংকেত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি মইনুল ইসলাম বলেন, আর্থিক খাতের এই সংকট অনেক গভীরে পৌঁছেছে। মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার সহজ হবে না। সুশাসন ও ভালো নীতির চর্চা ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয় বলেও মত দেন তিনি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, গ্রাহকের আস্থা ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করছে। অর্থ পাচারের অভিযোগ তদন্তে ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি’ কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং ব্যাংকগুলোতে সুশাসন নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০টি প্রতিষ্ঠান বর্তমানে ‘রেড জোনে’ রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অবসায়নের পথে রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে আমানত আটকে যাওয়ায় হাজারো গ্রাহক আন্দোলন করছেন।